উডের ডেসপ্যাচ- ১৮৫৪:
বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স এর সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতে ইংরেজি শিক্ষা এবং মহিলা শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিলেন। তিনি ১৮৫৪ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির কাছে একটি প্রস্তাবনা প্রেরণ করেন, উডের প্রস্তাবনা মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে অবশ্যই স্থানীয় ভাষাগুলি গ্রহণ করা উচিত, উচ্চ বিদ্যালয়গুলিকে অবশ্যই অ্যাংলো ভাষাতাত্ত্বিক ভাষা গ্রহণ করতে হবে এবং কলেজের স্তরের ভাষা হবে ইংরেজি। এটি উড-এর শিক্ষা প্রস্তাব হিসাবে পরিচিত। প্রস্তাবনাটিতে বৃত্তিমূলক এবং মহিলা শিক্ষার উপরও জোর দেওয়া হয়। কোম্পানির প্রশাসনিক কাজে ইংরেজি শ্রেণির ভারতীয় লোক নিয়োগের লক্ষে প্রস্তাবনাটি ছিল অত্যন্ত কার্যকারী। ব্রিটিশরা এই পর্যায়ে বেশ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল, এটি ছিল তাদের চূড়ান্ত পর্যায় যখন তারা সামাজিকভাবে নানা মুখি সংস্কার করেছিল। এর পরবর্তী পর্যায়ে তাদের নীতিগুলি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
• উড-এর শিক্ষা প্রস্তাবকে ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা বলা হয়।
• প্রস্তাবটি ১৮৫৪ সালের জুলাইয়ে আসে, সেসময় স্যার চার্লস উড বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের সভাপতি ছিলেন।
প্রস্তাবনা সমূহ
তার প্রস্তাবনা গুলো ছিল:
- ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের নৈতিক চরিত্র বৃদ্ধি করবে এবং এভাবে ই আই সি বিশ্বস্ত বেসামরিক কর্মচারী সরবরাহ করবে।
- প্রতিটি প্রদেশে একটি শিক্ষা বিভাগ স্থাপন করতে হবে।
- বোম্বাই, কলকাতা এবং মাদ্রাজের মতো বড় শহরগুলিতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে স্কুল চালু করতে হবে।
- অনুমোদিত বেসরকারী স্কুলগুলিকে সহায়তায় অনুদান দিতে হবে।
- ভারতীয় নাগরিকদের তাদের মাতৃভাষায়ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
- সরকারকে সর্বদা মহিলাদের শিক্ষাকে সমর্থন দিতে হবে।
- প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে স্থানীয় ভাষা এবং উচ্চ স্তরে মাধ্যম হবে ইংরেজি ভাষা।
- মেধাবৃত্তি দান করা
প্রস্তাবনা পরবর্তী গৃহীত ব্যবস্থা:
উডের প্রস্তাবনা প্রেরণের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।
- ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়, পাশাপাশি ১৮৮২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ইংরেজি শিক্ষার প্রচার এবং প্রসার লাভ করে।
উড-এর শিক্ষা প্রস্তাবের তাৎপর্য:
উড-এর শিক্ষা প্রস্তাব ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রফেসর এস.এন. মুখার্জি তাঁর “ভারতের শিক্ষার ইতিহাস” বইয়ে উড-এর শিক্ষা প্রস্তাবকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল বলে উল্লেখ করেছেন। এটি “ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা” হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রস্তাবনাগুলো প্রকৃত পক্ষে এতটাই বিস্তৃত যে ভারতীয় শিক্ষাবিদরা এখনও নির্ধারিত কাজগুলি সম্পাদনে সফল হতে পারেনি। এটি এমন একটি পরিকল্পনা যাতে ভারতীয় শিক্ষার সমস্ত দিককে যুক্ত করা হয়েছিল, আরও ভালোভাবে বলতে গেলে প্রস্তাবনাটিতে ইংরেজি এবং ভারতীয় ভাষার তুলনামূলক অবস্থানকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবনাটির উদ্দেশ্য অত্যন্ত আন্তরিক ছিল কিন্তু সরকার এটিকে বাস্তবায়নে ব্যার্থ হয়।
উড-এর শিক্ষা প্রস্তাবের সীমাবদ্ধতা:
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু সুস্পষ্ট ত্রুটির জন্য উড-এর শিক্ষা প্রস্তাবকে দায়ী করা হয়।
নিম্নে প্রস্তাবনাটির কিছু সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হলঃ
• কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রনয়নের কারণে ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
• বরাবরের মত ভারতীয় ভাষা এবং ভারতীয় সংস্কৃতি পশ্চাৎপদ এবং অবহেলিত ছিল। সর্বোপরি, প্রস্তাবনাটি ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
• প্রস্তাবনাটি কেবলমাত্র পরীক্ষামূলক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিল, নিয়মিত শিক্ষাদানের ব্যাপারে কোন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
আদতে প্রস্তাবনাটির গণশিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবে পরিণত হয়নি। তহবিলের অভাব এবং অনিয়ম থাকায় অনুদান-সহায়তা ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। পশ্চিমা জ্ঞান এবং সংস্কৃতি প্রচারে প্রস্তাবনাটির আগ্রহ লক্ষণীয়। জনশিক্ষা অধিদফতর জন সাধারণের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ সৃষ্টিতে ব্যার্থ হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়াশোনার পদ্ধতি ভারতীয় অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে নি। প্রস্তাবনাটি প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রচার করতে পারেনি। নারী শিক্ষা বরাবরের মত অবহেলিত থেকে যায়। প্রস্তাবনাটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরিত্র এবং নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ ঘতাতে পারেনি, বরং কিছু কেরানি ও হিসাবরক্ষক তৈরি করে।