জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন (1905-1938)

স্বদেশি আন্দোলন থেকে ছাত্রদের দূরে সরিয়ে রেখে আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে সরকার একটার পর একটা আইন জারি করতে থাকে । কার্লাইল সার্কুলার ( ১০ অক্টোবর , ১৯০৫ খ্রি. ) , লিয়ন সার্কুলার ( ১৬ অক্টোবর , ১৯০৫ খ্রি. ) , পেডলার সার্কুলার ( ২১ অক্টোবর , ১৯০৫ খ্রি. ) ইত্যাদি কুখ্যাত ফতােয়ায় স্কুল কলেজের ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলন বা সভা সমিতিতে যােগদান , এমনকি প্রকাশ্যে ‘ বন্দেমাতরম্ ’ ধ্বনি উচ্চারণ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয় । প্রত্যুত্তরে ২৪ অক্টোবর ( ১৯০৫ খ্রি. ) এক জনসভায় বিপিনচন্দ্র পাল ওইসব ফতােয়ার তীব্র সমালােচনা করেন । এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে স্বতন্ত্রভাবে সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে দেশে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন ।

জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য


বিদেশি শিক্ষা বর্জন করে ছাত্রদের দেশীয় শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা ছিল জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য । এই লক্ষ্য পূরণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক স্বদেশি উদ্যোগে বিদ্যালয় গড়ে ওঠে ।

শিক্ষালয় স্থাপন :


পূর্ববঙ্গের রংপুরে ৮ ই নভেম্বর ( ১৯০৫ খ্রি. ) কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত ও ব্রজসুন্দর রায়ের নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় । নভেম্বর ( ১৯০৫ খ্রি. ) মাসে কলকাতায় ছাত্রদের সরকার বিরােধী আন্দোলনে উৎসাহ দানের জন্য শচীন্দ্র বসুর সম্পাদনায় প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যান্টি – সার্কুলার সােসাইটি । সরকার বিরােধী কার্য কলাপের জন্য যে সব ছাত্ররা বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করাই ছিল এই সােসাইটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ।

জাতীয় শিক্ষায় অর্থ সাহায্য :


সুবােধচন্দ্র মল্লিক , জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরী , মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী , স্যার তারকনাথ পালিত , ড. রাসবিহারী ঘােষ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রচুর অর্থ সাহায্য দানের কথা ঘােষণা করেন । পাশাপাশি এই ব্যবস্থাকে সার্থক করে তুলতে এগিয়ে আসেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ , স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , হীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ মনীষী ।

বাংলায় জাতীয় শিক্ষার প্রসার :


সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে এক সভায় ৯২ জন সদস্য নিয়ে কলকাতায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ( ১৯০৬ খ্রি. ১১ মার্চ ) গঠিত হয় । ওই পরিষদের পরিচালনায় বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষালয় স্থাপিত হলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে । অরবিন্দ ঘােষকে অধ্যক্ষ করে একটি জাতীয় মহাবিদ্যালয় ( ১৯০৬ খ্রি. ১৪ আগস্ট ) প্রতিষ্ঠিত হয় । ওই বছরই স্থাপিত হয় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট ( ১৯০৬ খ্রি. ২৪ জুলাই ) । পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় শান্তিনিকেতন – শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা ছিল স্বদেশি যুগে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের এক সফল প্রয়াস ।

জাতীয় শিক্ষা অন্যান্য প্রদেশ :


উল্লেখ্য যে , জাতীয় শিক্ষার আদর্শ বাংলার বাইরেও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে । বােম্বাই , মাদ্রাজ , উত্তরপ্রদেশ , বেরার প্রভৃতি অঞ্চলে বহু জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । মুসলিপত্তমে একটি জাতীয় মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয় । ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে অন্ধ্রপ্রদেশে একটি জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় ।

জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ব্যর্থতা:


১৯১০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই জাতীয় শিক্ষা প্রসারের প্রচেষ্টা স্তিমিত হয়ে যায় । এই ব্যর্থতার পিছনে তিনটি বিশেষ কারণ কাজ করেছিল ।

  1. রাজনৈতিক স্বার্থ স্বদেশি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠায় জাতীয় শিক্ষাবিস্তারের দিকে আগ্রহ কমে যায় ।
  2. ওইসব বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ ছাত্রদের সরকারি চাকরির কোনাে আশা না থাকায় মধ্যবিত্ত বাঙালি এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যায় ।
  3. সরকারের বিরােধিতা , সেই সঙ্গে অর্থসংকট এই শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading