পাল আমলে সাহিত্য রচনার ওপর একটি সংক্ষিপ্ত টাকা লেখো। (Write a brief note on the literary writings during the Pala Period.)

পাল যুগে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, প্রাকৃত ও সৌরসেনী অপভ্রংশ। ভাষার প্রচলন ছিল। মানুষের কথ্য ভাষা ছিল মাগধী বা অপভ্রংশ। এই মাগধী বা অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। পালযুগের চর্যাপদের মধ্যে প্রাচীন বাংলার নমুনা দেখা যায়। চর্যাপদগুলিতে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের মনের ভাব লোকমুখের ভাষায় ব্যস্ত করেন। পাল যুগের কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত হলেন চতুর্বেদজ্ঞ দণ্ডপাণি, সন্ধ্যাকর নন্দী, জীমূতবাহন প্রমুখ।

পাল রাজাদের আনুকূল্যে কাব্য রচনা করে অনেকেই যশস্বী হন। এঁদেরই একজন ‘রামচরিত’ কাব্যকার অভিনন্দ। বিক্রমশীলের পুত্র যুবরাজ হারবর্ষের সভাকবি ছিলেন। তিনি। ধর্মপালের একটি উপাধি হল বিক্রমশীল। খ্রিস্টীয় নবম শতকের আর এক কবি হলেন গৌড় অভিনন্দ। সংকলয়িতা ‘শাঙ্গতধর’ তাঁর সংকলন গ্রন্থে গৌড় অভিনন্দের দুটি শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। গৌড় অভিনন্দ বাঙালি ছিলেন। অনেকে বলেন, গৌড় অভিনন্দ ‘কাদম্বরীকথাসাগর’ নামে একখানি কাব্যও রচনা করেন। কিন্তু কাদম্বরীকথাসাগরের রচয়িতা নিজের নামের পূর্বে গৌড় অভিষী ব্যবহার করেননি।

          পাল যুগে আর একখানি ‘রামচরিত’ কাব্য রচিত হয়েছিল। মদনপালের সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী 220টি আর্যাশ্লোকে এ কাব্য প্রণয়ন করেন। দ্ব্যর্থবোধক এই কাব্যে একদিকে যেমন রামপালের জীবনী বর্ণিত হয়েছে, অপরদিকে তেমনি শ্রীরামচন্দ্রের কাহিনি বিবৃত্ত হয়েছে। পাল ইতিহাসের উপাদানরূপে ‘রামচরিত’ কাব্যখানির অশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু ‘রামচরিত’ ইতিহাস নয়, ইতিহাস আশ্রয়ী এক কাব্য। পালযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী চক্রপাণি দত্ত। তিনি সম্ভবত পালরাজ নয়পালের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর ‘চিকিৎসা- সংগ্রহ’ শীর্ষক গ্রন্থে চিকিৎসাশাস্ত্রে পূর্ব ভারতের তৎকালীন অগ্রগতির পরিচয় পাওয়া যায়। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ মৌলিক

গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ধাতবগ্রন্থ প্রকরণে চক্রপানি যে মৌলিকত্ব প্রদর্শন করেছেন, তা অভিনব। চরক ও সুশ্রুতের ওপর তিনি যথাক্রমে ‘আয়ুর্বেদ দীপিকা’ এবং ‘ভানুমতী’ নামে দু-খানি টীকাগ্রন্থ রচনা করেন। আয়ুর্বেদ দীপিকা’ আবার ‘চরকতাৎপর্যদীপিকা’ নামেও পরিচিত। তাঁর লেখা অপর দু-খানি গ্রন্থ হল ‘শব্দচন্দ্রিকা’ এবং ‘দ্রব্যগুণসংগ্রহ’। প্রথমটি ভেষজ গাছগাছরা এবং আকর দ্রব্যাদির তালিকা, দ্বিতীয়টি পথ্যাদি নিরূপণ সংক্রান্ত।

পালপর্বে রচিত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, দর্শন ও সংস্কার বিষয়ক গ্রন্থাদির সংখ্যা বড়ো কম নয়। দক্ষিণ রাঢ়ের ভূরিশ্রেষ্ঠক গ্রামের অধিবাসী শ্রীধরভট্ট খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকের লোক ছিলেন। ‘ন্যায়কন্দলী’ নামে বৈশেষিক সূত্রের ওপর তিনি এক বিখ্যাত টীকাগ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এ ছাড়া তিনি রচনা করেন ‘অক্ষয়সিদ্ধি’ তত্ত্বপ্রবোধ, ‘তত্ত্বসংবাদিনী’ ও ‘সংগ্রহটীকা’ নামে অন্তত আরও চারখানি বেদান্ত ও মীমাংসা বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন।

শ্রীধরভট্টের সমসাময়িক ছিলেন উদয়ন। তিনি চারখানি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থগুলির নাম ‘লক্ষণাবলী’, ‘কিরণাবলী’, ‘কুসুমাজলী’ ও ‘আত্মতত্ত্ববিবেক’। প্রশস্তপাদের ‘পদার্থধর্মসংগ্রহ’ নামে বৈশেষিক দর্শনের একটি কাব্য আছে। একাদশ শতকের একজন ধর্মশাস্ত্রকার ছিলেন জিতেন্দ্রিয়। জীমূতবাহন, রঘুনন্দন ও শূলপাণির মতো বিদ্বজ্জনেরা তাঁর নামোল্লেখ করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ হারিয়ে গেছে। প্রায় একই সময়ে আবির্ভূত হয়েছিল ভবাদেবভট্ট-এর। তাঁর লেখা গ্রন্থাদির মধ্যে ‘তৌতাতি-মত-তিলক’, ‘প্রায়শ্চিতপ্রকরণ’ এবং ‘দশকর্মপদ্ধতি’ উল্লেখযোগ্য। সমসাময়িককালের এক যুগন্ধর শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এই ভবদেব ভট্ট। অদ্বৈত দর্শন, মীমাংসা, তর্কশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, আয়ুর্বেদ, গণিত, হোরাশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র, বৌদ্ধদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্যক ব্যুৎপত্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।

বৌদ্ধযান অবলম্বনে প্রচুর সংস্কৃত গ্রন্থ পালযুগে রচিত হয়। এই গ্রন্থগুলিকে তন্ত্রপ্রশ্নও বলা যেতে পারে। মূল গ্রন্থগুলির বেশিরভাগই বিনষ্ট হয়ে গেছে। তাদের তিব্বতি সংস্করণগুলিই বর্তমানে পাওয়া গেছে। বৌদ্ধযান সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে ও সিম্বাচার্যরা যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা গুঢ়, রহস্যময়। এ ভাষার পোশাকি নাম হল সন্ধা বা সন্ধি ভাষা।

** বৌশ্বতান্ত্রিক লেখকদের মধ্যে একজন অন্যতম ছিলেন মহাজেতারি। বিক্রমশীল বিহারের অন্যতম আশ্চর্য তিনি। বৌদ্ধ ন্যায় অবলম্বনে লেখা ‘হেতুতত্ত্বোপদেশ’, ‘ধর্মাধর্মবিনিশ্চয়’ এবং ‘কলাবতারতর্ক’ নামে তিনটি গ্রন্থ সম্ভবত তাঁরই রচনা। তা ছাড়া তিনি স্বায়ত্ত দু-খানি সূত্রগ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘সুগভমতবিভঙ্গকারিকা’ এদেরই একটি। একনিষ্ঠ জেতারি এগারোখানি বজ্রযানী সাধনের রচয়িতা।

বৌদ্ধতান্ত্রিক লেখকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। অতীশ নামেও তিনি পরিচিত। 16৪টি গ্রন্থের প্রণেতা তিনি। এদের মধ্যে অনেকগুলি ছিল অনুবাদ গ্রন্থ। গ্রন্থগুলির বেশিরভাগই বজ্রযানী সাধন, কয়েকখানি মহাযানী। তাঁর রচিত প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে ‘শিক্ষাসমুচ্চয়-অভিসময়’, ‘সূত্রার্থসমুচ্চয়োপদেশ’, ‘প্রজ্ঞাপারমিতা- পিন্ডার্থপ্রদীপ’, ‘সংগ্রহগর্ভ’, ‘মহাযানপথসাধনবর্ণসংগ্রহ’ এবং ‘বোধিমার্গপ্রদীপ’।

পাল যুগে বিক্রমশীল বিহারের আর এক প্রধান স্তম্ভ ছিলেন জ্ঞানশ্রীমিত্র। তিনি ছিলেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সমসাময়িক। বৌদ্ধ ন্যায়ের ওপর কার্যকারণভবসিদ্ধি নামে তিনি একখানি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। বজ্রযান মতবাদের ওপর প্রায় কুড়িখানা গ্রন্থ লিখেছেন অভয়াকরগুপ্ত। তিনি রামপালের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে ‘বজ্রযানাপত্তি-মঞ্জরী’, ‘যোগাবলী’, ‘মর্মকৌমুদী’ এবং ‘বোধিপদ্ধতি’। ‘হেরূপসাধন’ নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেছেন দিবাকরচন্দ্র। তিনি ছিলেন নয়পালের সমসাময়িক। মগধের বিক্রমশীল বিহারের অবধৃত কুমারচন্দ্র তিনখানি তাত্ত্বিক পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। টঙ্গদাস বা ভঙ্গদাস নামে আর এক বৌদ্ধ আশ্চর্য হেবজ্রতত্ত্বের ওপর ‘সুবিশদসম্পুট’ নামে একখানি ঢাকা রচনা করেন।

বৌদ্ধ দোঁহা ও চর্যাপদগুলি সম্ভবত পালযুগেই রচিত হয়েছিল। 1907 সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে চর্যাপদের পুথি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য আরও অনেক পুথি আবিষ্কার হয়। দোঁহা ও চর্যাপদগুলি 950 থেকে 1200 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত বলে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অভিমত প্রকাশ করেছেন। এই গীতগুলির রচয়িতারা সিদ্ধাচার্য নামে পরিচিত। পালযুগের দোঁহা-চর্যা পদাবলিতে যে ভাষা ব্যবহূত হয়েছে অনেকের মতে, তা আদি বাংলা ভাষা। ফলে পালযুগকে অনেকে বাংলা ভাষার উদ্ভবকাল বলে ধার্য করেন। এই গীতগুলি রচিত হয়েছে সৌরসেনী ও মাগধী অপভ্রংশ থেকে। বিবর্তিত এক লৌকিক ভাষায় গুঢ় আধ্যাত্মসাধনার নিগুঢ়তর তত্ত্ব এই দোঁহা ও পদগুলিতে ধ্বনিত হয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading