পাল সাম্রাজ্যের পতনের ওপর একটি টাকা লেখো। Write a note on the 8 downfall of the Pala Empire (Decline)

নয়পাল ও বিগ্রহপালের রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় মহীপালের সময় উত্তর বাংলায় দেখা দেয় সামন্ত বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে বরেন্দ্র অঞ্চলে পাল শাসনের বিলুপ্তি ঘটে। রামপাল বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারে তৎপর হন। রামাবর্তী নামক

স্থানে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। রামপালকে পাল বংশের শেষ ‘মুকুটমণি’ বলা হয়। প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নয়পাল (1043-1058) 15 বছর রাজত্ব করেন। নয়পালের পর মহীপালের পৌত্র তৃতীয় বিগ্রহপাল 16 বছর (আনুমানিক 1058- 1075) রাজত্ব করেন। তাঁদের রাজত্বকালের প্রধান ঘটনা ছিল কলচুরি রাজ লক্ষ্মীকর্ণের উপর্যপুরি আক্রমণ। তিব্বতী গ্রন্থ থেকে জানা যায় প্রথমে মগধ আক্রমণ করে কর্ণ নয়পালকে পরাজিত করেন। তবে শেষ পর্যন্ত নয়পাল কর্ণকে পরাজিত করেন এবং বিখ্যাত বৌদ্ধ আচার্য অতীশ দীপঙ্করের মধ্যাস্পতায় বিরোধের মীমাংসা হয়। তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে কর্ণ দ্বিতীয়বারের মতো পাল সাম্রাজ্য আক্রমণ করে জয়লাভ করেন। বীরভূম জেলার পাইকোরে প্রাপ্ত কর্ণের শিলাস্তস্তলিপি হতে মনে করা হয় যে, তিনি পাল সাম্রাজ্যের কিছু অংশ অধিকার করেছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিত’ প্রশ্নে বিগ্রহপালের বিজয়ের কথা এবং বিগ্রহপাল কর্তৃক কর্ণের কন্যা দৌতলশ্রীকে বিবাহ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে ধারণা করা হয় যে, বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিরোধের সমাপ্তি ঘটেছিল।

কলচুরি আক্রমণ ছাড়াও পাল সাম্রাজ্য কল্যাণের চালুক্য বংশের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। চালুক্য লিপিমালায় বংশীয় রাজা প্রথম সোমেশ্বর, দ্বিতীয় সোমেশ্বর ও ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের শাসনকালে একাধিকবার গৌড় আক্রমণের উল্লেখ আছে। বিলহন রচিত ‘বিক্রমাঙ্কদেব চরিত’ গ্রন্থেও বিক্রমাদিত্য কর্তৃক গৌড় রাজ্য আক্রমণের উল্লেখ আছে। এসব প্রমাণ থেকে অনুমান করা হয় 1042-1076 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চালুক্যরাজ কর্তৃক পাল সাম্রাজ্য একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছিল।

পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে ওড়িশার রাজগণও বাংলা আক্রমণ করেন। একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সোমবংশীয় রাজা মহাশিবগুপ্ত যযাতি গৌড় ও রাঢ় অঞ্চল জয় করেন এবং রাজা উদ্যেতকেশরী গৌড়ের সৈন্যদলকে পরাজিত করেন বলে লিপিতে প্রমাণ আছে। একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রত্নপালও বাংলা আক্রমণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। সুতরাং বলা যায়, নয়পাল ও বিগ্রহপালের রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্য চারদিক থেকে আক্রান্ত হয়েছিল। এই অবস্থা তাদের দুর্বলতার কথাই প্রমাণ করে।

দ্বিতীয় মন্ত্রীগাল ও সামন্তবিদ্রোহ: দ্বিতীয় মহীপাল সিংহাসন আরোহণের সঙ্গো সঙ্গো তাঁর অন্য দুই ভাতা দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপালকে তিনি কারারুদ্ধ করেছিলেন। বরেন্দ্র অঞ্চলে যে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা মহীপালের অন্যায় আচরণ অর্থাৎ, নিছক অহেতুক সন্দেহের বশে ভ্রাতৃদ্বয়কে কারারুদ্ধ করারই ফল। যুদ্ধে মহীপাল পরাজিত ও নিহত হন এবং কৈবর্ত প্রধান দিব্য বরেন্দ্র (উত্তর বাংলা) অধিকার করে সেই অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। উত্তর বাংলায় ও তাঁর বংশের শাসন বেশ কিছুদিন প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিদ্রোহী সামন্তচক্রের সঙ্গে দিব্যের সম্পর্ক থাকাই স্বাভাবিক, তা না হলে বিদ্রোহীদের সাফল্য দিব্যের ক্ষমতা দখলে কেন সাহায্য করবে। রাজকর্মচারী দিব্যের এরূপ আচরণ সন্ধ্যাকর নন্দীর দৃষ্টিতে ছিল ‘ধর্মবিপ্লব’। রাজকর্মচারীর ‘ধর্ম’ বিচ্যুতির অর্থে ‘ধর্মবিপ্লব’ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

রামপাল ও বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার: রামপাল (1082-1124) রাজ্যভার গ্রহণ করেই বরেন্দ্র (উত্তর বাংলা) অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। তাঁর রাজত্বের প্রথমদিকে কৈবর্ত প্রধান দিব্য তাঁর বিরুদ্ধে সাফল্যজনক আক্রমণ চালিয়েছিলেন। রামপাল বেশ প্রৌঢ় অবস্থায় সিংহাসনে আরোহণ করেন। তথাপি তাঁর রাজত্বকাল ছিল নিঃসন্দেহে সাফল্যপূর্ণ। তাঁর রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্য শেষবারের মতো উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্য দ্রুত গতিতে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। তাই রামপালকে পালবংশের ‘শেষ মুকুটমনি’ বলা হয়।

প্রথম মহীপালের পরবর্তী প্রায় একশত বছর পাল সাম্রাজ্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি ধীরে ধীরে অবনতি ও বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। পরবর্তীকালে পালরাজাদের মধ্যে একমাত্র রামপালই কিছু শৌর্য-বীর্যের পরিচয় দেন এবং পালবংশের অবনতির গতিকে ক্ষণকালের জন্য হলেও রোধ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু রামপালের পর বিলুপ্তিকে রোধ করা সম্ভব হয়নি। দ্বাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের কোনো এক সময়ে সুদীর্ঘ চারশত বছরের পাল শাসনের অবসান ঘটে।

মদনপালই সম্ভবত ছিলেন শেষ পাল সম্রাট। তাঁর সময় পাল সাম্রাজ্য বাংলার ভূ-ভাগ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরও কিছুদিন বিহারের অংশবিশেষে টিকে ছিল। পলপাল ও গোবিন্দপাল নামক রাজা-যাঁদের লিপি বিহারে পাওয়া গেছে, তাঁরা পাল বংশের কিনা তা সঠিক করে বলা যায় না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading