প্রাচীন ভারতে যাঁরা বিষুকে ইষ্টদেবতারূপে পূজা করতেন, তাঁরা বৈয়ব নামে পরিচিত হন এবং তাঁদের ধর্ম ছিল বৈষুবধর্ম। যেহেতু বিষ্ণু ‘ভাগবত’ নামেও পরিচিত, তাই বৈয়বধর্মালম্বীদের ‘পরমভাগবত’ বা ‘পরম বৈষুব’ ও বলা হত। এই ধরনের উপাধি ও পদবির ব্যবহার প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন রাজবংশের শাসকদের দ্বারা উৎকীর্ণ লেখ গুলিতে পাওয়া যায়। গুপ্ত রাজারা নিজেদের ‘পরমভাগবত’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের অর্থাৎ, পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির রাত বংশের রাজা শ্রীধারণরাত তাঁর কৈলান শাসনে নিজেকে ‘পরমবৈষুব’ রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।
বাংলায় বিভিন্ন লেখমালায় ‘বাসুদেব’, ‘নারায়ণ’ নামটি বহুবার পাওয়া যায়। প্রথমদিকে ভাগবত ধর্ম বৈদিক ধর্মের জটিল যাগযজ্ঞ থেকে দূরে থেকে স্বাতন্ত্র্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীকালে বৈদিক দেবতা বিহ্বর সঙ্গে বাসুদেব-কৃত্বের সহযোগে তিনটি স্বাধীন দেবতা একটিই রূপ হিসেবে পূজিত হতে থাকে। শশাঙ্কের রাজত্বকালে মেদিনীপুর শাসনে, ভবদেবের শালবনবিহার তাম্রশাসনে এবং নয়পালের কৃযুদ্বারিকা মন্দির লেখতে বিন্তু নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও লোকনাথের ত্রিপুরা তাম্রশাসন, ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে বিছুকে ‘নারায়ণ’ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রাচীন বাংলার বৈঘ্নবধর্মের বৈশিষ্ট্য জানতে প্রয়োজন হয় লেখ ও শাসনগুলির সঠিক পাঠ ও অনুবাদ। কেশবসেনের ইদিলপুর তাম্রশাসনে ‘গদাপাণি’ নামটির ব্যবহার করা হয়েছে। বিষুর লীলা ও তাঁর ভিন্ন নামের পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও রূপ প্রকাশিত হয়। যেমন-নয়পালের কৃষ্ণদ্বারিকা মন্দিরে লেখতে বিছুকে ‘মুরারি’ বলা হয়েছে, যার অর্থ মুর নামক অসুরের বিনাশকারী। এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য যে, বিষুকে তাঁর শক্তি অর্থাৎ, লক্ষ্মী বা শ্রী-র সহযোগী হিসেবেও ধর্মপালের খালিমপুর শাসন, বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তি, লড়ইচন্দ্রের ময়নামতী শাসনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলার বৈব্লবধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিহ্বর বিভিন্ন অবতারগুলির উপাসনা। বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনে বিষুকে ‘শ্বেতবরাহস্বামী’ বলা হয়েছে। তা ছাড়াও বরাহ, নৃসিংহ অবতারের উল্লেখ আছে ভাস্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসন, বর্মন বংশীয় বেলাব শাসনে। পুণ্ড্রবর্ধনের রাতবংশীয় শ্রীধারণরাতের কৈলাশ শাসনে।
বঙ্গদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষ্ণু অবতার হলেন শ্রীকৃষ্ণ। পালবংশের নারায়ণ পালের গরুড় স্তস্তলেখতে নয়পালের ইর্দা তাম্রশাসন এবং সেনবংশীয় লক্ষণ সেনের মাধাইনগর শাসন, দামোদরদেবের মেহার তাম্রশাসন, দশরথদেবের পাকামোড়া তাম্রশাসনে শ্রীকৃয় অবতার সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলায় পৌরাণিক ধর্মের ওপর ভিত্তি করে বৈষুব ধর্মের একাধিক সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। কিন্তু এই ভিন্ন সম্প্রদায়গুলির মধ্যে কখনও সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়নি। তা ছাড়াও বৈযুব ও শৈবধর্মের মধ্যেও কোনোরকম ভেদাভেদ এই সময়ে লক্ষণীয় হয়নি। বিষু ও শিবকে হরিহর রূপে উল্লেখও চোখে পড়ে।
বিষুর শ্রীকৃষ্ণ অবতারের সঙ্গে রাধার উপাসনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জয়দেব রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যে রাধাকৃয়ের যুগলরূপ দেখা যায়। হল রচিত ‘গাথাসপ্তশতী’ কাব্যে সর্বপ্রথম ‘রাধা’ নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির সঙ্গ্যে অনুরূপ নকশার উপস্থাপনা পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ধোন্দাই থেকে প্রাপ্ত তারা-র প্রতিমূর্তি।
স্তূপ নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলায় পোড়ামাটির ইটের ব্যবহারের প্রাচুর্য দেখা গেলেও যোগী গুহার যে পাথরের স্তূপটি আবিষ্কৃত হয়েছে তার নির্মাণশৈলী বিহারে আবিষ্কৃত ভিত্তিসহ স্তূপের অনুরূপ। এই গুহার স্থাপত্যশৈলী আকর্ষণীয়, কারণ এর প্রতিটি গম্বুজ একটি উচ্চ নলকারের প্রতিনিধিত্ব করে। এই স্তূপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল স্তূপের হর্মিকাটি বৃত্তাকার নয়, বর্গাকার এবং হিন্দু মন্দিরশৈলীর আমলক-শিলার মতন। কোনো স্তূপে এই ধরনের বৈশিষ্ট্য যোগী গুহার ক্ষেত্রে প্রথমবার লক্ষ করা যায়।
প্রাচীন বাংলার স্তূপ নির্মাণশৈলী সম্পর্কে বৌদ্ধ সাহিত্যবলিতে বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বরেন্দ্রভূমির মৃগ-স্থাপনা স্তূপ। যার নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয়বস্তু রচিত ও অঙ্কিত রয়েছে অষ্টসহত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা নামক গ্রন্থে। স্তূপটির নির্মাণশৈলীতে রয়েছে ছ-টি সোপান সমন্বিত একটি ভিত্তি, ওপরে একটি বৃত্তাকার গম্বুজ যার চারপাশে রয়েছে চারটি কুলুঙ্গি এবং প্রতিটিতে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। গম্বুজটির শীর্ষ মালা দ্বারা সজ্জিত।
‘অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’য় এই ধরনের স্তূপের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় তা হল, তুলাক্ষেত্রে বর্ধমান স্তূপ। এই ক্ষেত্রে দুটি একই উচ্চতার স্তূপ পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে। যার ভিত্তিটি বর্গাকার, প্রতিটি পাশে প্রক্ষেপণ রয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন ছাঁচ দ্বারা পৃথক করা হয়েছে এবং ওপরে রয়েছে একটি গম্বুজ। এই স্তূপটিতে কুলুঙ্গি অবর্তমান। অন্য স্তূপটির ভিত্তি আয়তকার এবং কুলুঙ্গিসহ একটি বর্গাকার সোপান উপস্থিত।
প্রাচীন বাংলায় স্তূপ নির্মাণ ও শৈলীর যে মূল বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় তা হল- এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ বর্গাকার ভিত্তিপ্রস্তরের সঙ্গে অনুভূমিক ছাঁচনির্মাণ ছিল প্রচলিত। স্তূপ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগতভাবে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পর্কে ছিল। বাংলায় এই শৈলীর বিকাশ ও প্রচলন শুরু হয়েছিল প্রাক্-পাল যুগের স্থানীয় আঞ্চলিক রাজাদের উদ্যোগে। পরবর্তীকালে পাল বংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও স্তূপ বিহার নির্মাণ রাজকীয় অনুদান প্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন বাংলার উত্তরাংশে অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্রভূমিতে স্তূপ ও বিহার নির্মাণ বহুল প্রচলিত হয়। এ ছাড়াও পাল রাজাদের উপরিক ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের তরফ থেকে বিভিন্ন দানকৃত স্তূপের নিদর্শন পাওয়া যায়।