‘আগমনী’ ও ‘বিজয়া’র পদগুলিতে শাক্ত কবিগণ মা ও মেয়ের হৃদয়ের বেদনাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা আলোচনা করো।

আগমনী’ ও ‘বিজয়া’র পদগুলিতে শাক্ত কবিগণ মা ও মেয়ের হৃদয়ের বেদনাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন—আলোচনা

ভূমিকা

বাংলা শাক্ত পদাবলির একটি বিশেষ ও আবেগঘন শাখা হলো আগমনী ও বিজয়ার পদ। এই পদগুলিতে দেবী দুর্গা আর দূরবর্তী ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক নন—তিনি একজন ঘরের মেয়ে, যার বাপের বাড়ি আগমন ও শ্বশুরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ঘিরে আবর্তিত হয় মা-মেয়ের হৃদয়স্পর্শী আবেগ। শাক্ত কবিগণ পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যে রেখে মানবিক সম্পর্কের বেদনা, আকাঙ্ক্ষা, বিরহ ও মমতা এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যে দেবী দুর্গা সম্পূর্ণরূপে মানবী হয়ে ওঠেন। বিশেষত আগমনী ও বিজয়ার পদে মা মেনকা ও কন্যা উমার হৃদয়ের যন্ত্রণা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য আবেগধারার সৃষ্টি করেছে।

১. আগমনী পদ : প্রতীক্ষা ও আনন্দবেদনার মিশ্র রূপ

(ক) আগমনী পদের মূল সুর

আগমনী পদে মূল বিষয় হলো—দীর্ঘ বিরহের পর কন্যার আগমন। উমা সারা বছর কৈলাসে থাকেন, পিতৃগৃহে আসেন মাত্র কয়েক দিনের জন্য। এই অল্প সময়ের আগমনই মায়ের কাছে পরম আনন্দের, অথচ এই আনন্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের আশঙ্কা।

শাক্ত কবিরা এখানে তুলে ধরেছেন—

  • সন্তানের জন্য মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
  • অভাবী সংসারে মেয়েকে আনতে না পারার কষ্ট
  • ঐশ্বর্যের কন্যা হলেও মাতৃহৃদয়ের দারিদ্র্যবোধ

(খ) মেনকার মাতৃত্ববেদনা

মেনকা শাক্ত পদে এক অসাধারণ মানবী চরিত্র। তিনি দেবমাতা নন, তিনি—

  • দরিদ্র গৃহিণী
  • স্বামী হিমালয়ের অভাবী সংসারের অংশ
  • মেয়েকে ঠিকমতো খাওয়াতে না পারার লজ্জায় কাতর

অনেক আগমনী পদে দেখা যায়, মেনকা উমাকে বলেন—

“মা, তোকে কী খাওয়াব?
ঘরে যে কিছুই নেই।”

এখানে দেবীর মা হয়ে ওঠেন বাংলার সাধারণ দরিদ্র মা। ঐশ্বরিকতার বদলে কবি তুলে ধরেন অভাব, লজ্জা ও অপূর্ণ মাতৃত্বের বেদনা

(গ) উমার কন্যাসুলভ অনুভব

আগমনী পদে উমাও কেবল দেবী নন—

  • তিনি বাপের বাড়ির আদরে অভ্যস্ত কন্যা
  • মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝেন সংসারের দুঃখ
  • নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন মায়ের সুখের জন্য

উমার এই সংযত বেদনা মা-মেয়ের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। দেবী এখানে সন্তানের চেয়ে বেশি মেয়ের ভূমিকা পালন করেন।

২. বিজয়া পদ : বিচ্ছেদের চরম রূপ

(ক) বিজয়ার আবহ

আগমনী যেখানে আগমনের আনন্দ, বিজয়া সেখানে চিরাচরিত বিচ্ছেদের কান্না। বিজয়া পদে দুর্গার কৈলাসে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তকে কেন্দ্র করে মা-মেয়ের হৃদয়ভাঙা বেদনা প্রকাশ পায়।

এখানে—

  • আনন্দের সব রঙ মুছে যায়
  • কয়েক দিনের সুখ মুহূর্তেই স্মৃতিতে পরিণত হয়
  • মাতৃহৃদয় আবার শূন্য হয়ে পড়ে

(খ) মেনকার অসহায়তা ও অভিযোগ

বিজয়া পদে মেনকার কণ্ঠে শোনা যায়—

  • স্বামীর প্রতি অভিযোগ
  • শিবের প্রতি ক্ষোভ
  • নিয়তির প্রতি আর্তনাদ

তিনি বলেন—

“বছরে একবার মেয়েটাকে দিয়েছিস,
তাও আবার কেড়ে নিলি!”

এই অভিযোগ কোনো দেবীর নয়—এ এক অসহায় মায়ের চিৎকার। শাক্ত কবিগণ এই আর্তিকে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যে পাঠকের হৃদয় আন্দোলিত হয়।

(গ) উমার অন্তর্দ্বন্দ্ব

বিজয়া পদে উমার বেদনাও গভীর—

  • তিনি স্বামীর গৃহে কর্তব্যবদ্ধ
  • আবার মাতৃহৃদয় ছিঁড়ে বিদায় নিতে বাধ্য

উমা জানেন, মাকে ফেলে যাওয়া অন্যায়; তবু সমাজ ও ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি বিদায় নেন। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে আরও মানবী করে তোলে।

৩. মা-মেয়ের সম্পর্ক : শাক্ত পদাবলির শ্রেষ্ঠ মানবিক রূপ

শাক্ত কবিগণ দুর্গাকে দেবীর আসন থেকে নামিয়ে এনে স্থাপন করেছেন—

  • বাঙালি সমাজের কন্যা
  • সংসারী নারীর বাস্তবতার মধ্যে

এখানে—

  • মা কন্যার জন্য আকুল
  • কন্যা মায়ের কষ্ট বুঝে নীরব
  • দু’জনেই নিয়তির কাছে অসহায়

এই সম্পর্ক কোনো অলৌকিক সম্পর্ক নয়—এ এক চিরন্তন মানবিক বন্ধন

৪. সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন

আগমনী ও বিজয়ার পদে ফুটে ওঠে—

  • পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা
  • বিবাহিত নারীর পিতৃগৃহে সীমিত অধিকার
  • মায়ের একাকিত্ব ও সামাজিক অসহায়তা

এই পদগুলি শুধু ধর্মীয় নয়—এগুলি নারীজীবনের সামাজিক দলিল

৫. ভাষা ও কাব্যরীতির আবেগঘনতা

শাক্ত কবিরা ব্যবহার করেছেন—

  • সহজ কথ্য ভাষা
  • ঘরোয়া উপমা
  • হৃদয়ছোঁয়া আবেদন

এর ফলে পদগুলি হয়ে উঠেছে—

  • গানযোগ্য
  • স্মরণযোগ্য
  • আবেগে পরিপূর্ণ

লোকসংস্কৃতি ও উচ্চ কাব্যিকতার এই মেলবন্ধন শাক্ত পদাবলিকে অনন্য করে তুলেছে।

উপসংহার

আগমনী ও বিজয়ার পদে শাক্ত কবিগণ দুর্গাকে দেবীর মূর্তি থেকে নামিয়ে এনে একজন কন্যা ও এক জননীর সম্পর্কের প্রতীক করে তুলেছেন। এখানে ঐশ্বর্যের পরিবর্তে মানবিকতা, শক্তির পরিবর্তে দুর্বলতা, দেবত্বের পরিবর্তে মাতৃত্ব ও কন্যাসত্তা মুখ্য হয়ে উঠেছে। মা মেনকা ও কন্যা উমার হৃদয়বিদারক বেদনা বাংলা সাহিত্যে এমন এক আবেগময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, যেখানে পাঠক দেবীকে নয়—নিজের মাকে ও নিজের মেয়েকে খুঁজে পান।

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading