আচরণবাদ কাকে বলে?
আচরণবাদ (Behaviorism) মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব এবং দর্শন, যা ১৯শ শতকের শেষ এবং ২০শ শতকের শুরুর দিকে বিকশিত হয়। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো মানুষের এবং প্রাণীদের আচরণকে বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং পরিমাপ করা। আচরণবাদীরা বিশ্বাস করেন যে, মানসিক অবস্থা বা চেতনার মতো অবাস্তব এবং পরোক্ষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার চেয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণই মনোবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য হওয়া উচিত।
এই তত্ত্বের জনক হিসেবে সাধারণত জন বি. ওয়াটসন-এর নাম উল্লেখ করা হয়। তিনি ১৯১৩ সালে তার প্রবন্ধ “Psychology as the Behaviorist Views It”-এর মাধ্যমে আচরণবাদকে একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বারহাস এফ. স্কিনার এবং ইভান পাভলভ-এর মতো মনোবিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বকে আরও বিকশিত করেন।
আচরণবাদের সংজ্ঞা
আচরণবাদ হলো সেই মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা বলে যে মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাগুলি সম্পূর্ণরূপে পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং পরিমাপযোগ্য আচরণের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। মন বা চেতনার মতো অবাস্তব এবং অবাধে পর্যবেক্ষণযোগ্য ধারণার পরিবর্তে আচরণবাদীরা শুধুমাত্র পরিবেশের সঙ্গে আচরণের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
আচরণবাদের মূল বৈশিষ্ট্য
১. পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণে গুরুত্ব
আচরণবাদীরা মনে করেন মনোবিজ্ঞানের গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হওয়া উচিত মানুষের এবং প্রাণীদের সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণ। চেতনা, আবেগ, বা অভিজ্ঞতার মতো বিষয়গুলোকে তারা অবৈজ্ঞানিক মনে করেন কারণ সেগুলো পরিমাপ করা যায় না।
২. উদ্দীপক এবং প্রতিক্রিয়া (Stimulus-Response)
আচরণবাদের মতে, যে কোনো আচরণ উদ্দীপক (Stimulus) এবং প্রতিক্রিয়া (Response)-এর মধ্যে সম্পর্কের ফল। অর্থাৎ কোনো উদ্দীপকের ফলে যে আচরণ দেখা যায়, সেটাই বিশ্লেষণের বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঘণ্টার শব্দে কুকুরের মুখে লালা নিঃসরণ হওয়ার পেছনে ইভান পাভলভের শর্তিত প্রতিক্রিয়ার (Classical Conditioning) তত্ত্ব।
৩. পরিবেশের ভূমিকা
আচরণবাদে পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। মানুষের আচরণ পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং উদ্দীপনার ভিত্তিতে তৈরি হয়। “পরিবেশই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে” এই ধারণাটি স্কিনারের মতো মনোবিজ্ঞানীরা তুলে ধরেছিলেন।
৪. শিক্ষণ তত্ত্ব (Learning Theory)
আচরণবাদে শিক্ষণকে মূলত শর্তিতকরণ (Conditioning)-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এটি দুই ধরনের—
i) শাস্ত্রীয় শর্তিতকরণ (Classical Conditioning) – ইভান পাভলভের তত্ত্ব
ii) অপারেন্ট শর্তিতকরণ (Operant Conditioning) – বি.এফ. স্কিনারের তত্ত্ব
৫. চেতনা বা মানসিক অবস্থার প্রতি অবহেলা
আচরণবাদীরা চেতনাকে গুরুত্ব দেন না। তারা মনে করেন চেতনা এমন একটি বিমূর্ত ধারণা যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
৬. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
আচরণবাদ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষণ এবং গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়। পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ এবং পরীক্ষার মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
৭. সাধারণীকরণ এবং নির্ধারণবাদ
আচরণবাদীরা বিশ্বাস করেন যে একই নিয়ম সমস্ত প্রাণী এবং মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের মতে, সব আচরণ পূর্বনির্ধারিত এবং নিয়মমাফিক।
আচরণবাদের প্রধান মনোবিজ্ঞানী ও তাদের অবদান
১. ইভান পাভলভ (Ivan Pavlov) এবং শাস্ত্রীয় শর্তিতকরণ
ইভান পাভলভ একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেছিলেন যেখানে তিনি দেখান যে একটি নির্দিষ্ট উদ্দীপক (ঘণ্টার শব্দ) একটি প্রতিক্রিয়া (কুকুরের মুখে লালা) তৈরি করতে পারে। এটি ছিল শাস্ত্রীয় শর্তিতকরণ (Classical Conditioning)-এর ভিত্তি।
২. জন বি. ওয়াটসন (John B. Watson) এবং আচরণবাদের প্রচলন
ওয়াটসন বিশ্বাস করতেন যে আচরণই হল মনোবিজ্ঞানের একমাত্র বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। তিনি বলেন, “Give me a dozen healthy infants, well-formed, and my own specified world to bring them up in and I’ll guarantee to take any one at random and train him to become any type of specialist I might select…”.
৩. বি.এফ. স্কিনার (B.F. Skinner) এবং অপারেন্ট শর্তিতকরণ
স্কিনার “Operant Conditioning” তত্ত্বের প্রবক্তা। তিনি বলেন যে আচরণকে পুরস্কার বা শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তিনি “Skinner Box” নামক যন্ত্রের মাধ্যমে গবেষণা চালিয়েছিলেন।
আচরণবাদের সীমাবদ্ধতা
১. চেতনা ও মানসিক প্রক্রিয়ার অবহেলা
আচরণবাদীরা চেতনা, আবেগ, অনুভূতি, এবং চিন্তাভাবনার মতো মানসিক প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষের আচরণকে পুরোপুরি বোঝার জন্য এই বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
২. সৃজনশীলতা এবং মুক্ত ইচ্ছার ব্যাখ্যার অভাব
আচরণবাদ মানুষের সৃজনশীলতা বা নতুন ধারণা তৈরি করার ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এছাড়া মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়টিও এই তত্ত্বে অবহেলিত।
৩. সীমাবদ্ধ সাধারণীকরণ
প্রাণীদের ওপর করা গবেষণার ফলাফল প্রায়ই মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু মানুষের আচরণ অনেক বেশি জটিল এবং তা সহজে প্রাণীদের গবেষণার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
৪. অভ্যন্তরীণ প্রেরণার অস্বীকৃতি
আচরণবাদীরা বিশ্বাস করেন যে সব আচরণই বাহ্যিক উদ্দীপনার ফল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রেরণা বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যকেও আচরণের কারণ হিসেবে গণ্য করা উচিত।
৫. অনুভূতি এবং মূল্যবোধের গুরুত্বহীনতা
আচরণবাদ অনুভূতি, নৈতিকতা, এবং মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করে। কিন্তু এগুলো মানুষের আচরণের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
৬. ব্যক্তিত্ব বিকাশের ব্যাখ্যার অভাব
আচরণবাদ ব্যক্তি বিশেষের চরিত্র গঠন, ব্যক্তিত্ব বিকাশ, এবং মানসিক জটিলতাকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়।
উপসংহার
আচরণবাদ মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। এটি মনোবিজ্ঞানকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে শিক্ষণ তত্ত্ব, আচরণগত চিকিৎসা, এবং শিশু মনোবিজ্ঞানে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তবে চেতনা এবং অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থাকে অস্বীকার করায় এটি সমালোচিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কগনিটিভ সাইকোলজি এবং হিউম্যানিস্টিক সাইকোলজি আচরণবাদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে দূর করার চেষ্টা করেছে। তা সত্ত্বেও আচরণবাদ মনোবিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য তত্ত্ব হিসেবে আজও গুরুত্বপূর্ণ।