উত্তরবঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের অধীনে রাজ্য গঠনের পটভূমি ব্যাখ্যা করো। (Explain the formation of state under the Palas in North Bengal.)

সমাজব্যবস্থার বর্ধিত রূপ হল রাষ্ট্র। সাধারণত একটি সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠী জাতীয় চেতনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা নিরাপত্তা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে নিজস্ব শাসন কাঠামোর আলোকে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলে। প্রাচীন বাংলার রাষ্ট্রীয় গঠন ও কাঠামো বিন্যাসের ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল শাসনের জন্য পালযুগ বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। মৌর্য ও গুপ্ত উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পাল রাজারা বাংলায় এক সুসংগঠিত ও সুসমন্বিত শাসন কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। এর পরিধি বাংলার ভূখণ্ড ছাড়িয়ে কামরূপ এমনকি উত্তর ভারতের সুবিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাল শাসন কাঠামোর একটি ব্যতিক্রমী দিক হল পাল রাষ্ট্রব্যবস্থা। পাল রাজাদের দীর্ঘস্থায়ী ও পরাক্রমশীল শাসনব্যবস্থার পিছনে তাদের রাষ্ট্র ব‍্যবস্থার কাঠামোর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

                          সাধারণত পালযুগীয় বাংলা বলতে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে নগরগুলি হল বরেন্দ্রী, পাটলিপুত্র, গৌড়, সুজেয়, সোমপুর, রমাবর্তী, তাম্রলিপ্ত, জগদ্দল প্রভৃতি। নীহাররঞ্জন রায়-এর মতে, “দেশ ও জাতির বাস্তব ইতিহাস জানতে হলে সর্বাগ্রে দেশের ভৌগোলিক পরিচয় লওয়া প্রয়োজন।কিছুক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে তথা প্রাচীন বাংলায় নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। পাল যুগেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। গুপ্ত উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে

পাল রাজারা একটি সুবিন্যস্ত ও সুদৃঢ় রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলেন, যা প্রায় চার শতাব্দীব্যাপী অটুট ছিল এবং একই সঙ্গে পরবর্তী শাসনব্যবস্থার রূপায়ণে রূপকার ভূমিকা রেখেছিল।

রাজতন্ত্র ও রাজা। কৌটিল্যের ‘সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব’-এর মধ্যে স্বামী বা রাজাই হলেন অন্যান্য অঙ্গের প্রতিভূস্বরূপ, রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজা ব্যতীত ছ-টি অঙ্গ সুসংবদ্ধ থাকলেও বাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৌটিল্যের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে রাজাই রাজ্য, সকল প্রকৃতি বা অংশের সংক্ষিপ্ত রূপ। পাল যুগের তাম্রলিপিতে বর্ণিত প্রশস্তি থেকে এটি সুষ্পষ্ট যে গুপ্ত রাজাদের ন্যায় পাল বাজতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্টা ছিল কেন্দ্রীভূত বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যদিও তা ছিল বিরল দৃষ্টান্ত। পাল লিপিমালায় রাজদের সার্বভৌমত্বের স্বাক্ষর হিসেবে ‘পরমেশ্বর’, ‘পরম ভট্টারক’, ‘মহারাজাধিরাজ’ প্রভৃতি উপাধি গ্রহনের প্রমাণ পাওয়া যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে রাজাই ছিলেন প্রধান সেনাধ্যক্ষ। যেমন, ধর্মপাল, দেবপাল, রামপাল প্রমুখ রাজগণ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রাদেশিক শাসনকর্তারা এবং সকল সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁদের কাজের জন্য রাজার নিকট দায়ী থাকতেন। কেন্দ্রীয় সরকার তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হত। প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন, উপাধি বা পুরস্কার বিতরণের কাজ পরিচালনা করতেন রাজা স্বয়ং। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে রাজার ক্ষমতা স্বৈরাচারী শাসকের মতো মনে হলেও বাস্তবে রাজার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হত নানাভাবে। রাজার ক্ষমতার অংশীদার ছিলেন মন্ত্রীগণ এবং উচ্চ রাজকর্মচারীবৃন্দ। গ্রামসভা ও নগর পরিষদ এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত, ফলে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ, যুদ্ধঘোষণা, শান্তি স্থাপন ব্যতীত অন্যান্য সরকারি বিষয়াদিতে স্থানীয় স্বায়শাসন বিদ্যমান ছিল। পালরাজাগণ শাসন পরিচালনার পাশাপাশি সমাজ, অর্থনীতি এমনকি ধর্মীয় বিধায়দিও পর্যবেক্ষণ করতেন।

প্রধান রানি: রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে প্রধান রানি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব যুগের অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক কৌটিল্যের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মন্ত্রী ও প্রধান পুরোহিতের মতোই রানি ছিলেন প্রথম শ্রেণির রাজকর্মকর্তা। তিনি বেতন বাবদ রাজকোশ থোকে 48000 পল-সামগ্রী পেতেন। কিন্তু পালযুগের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। প্রায় সকল পাল রাজার ভূমিদান লিপিতেই রানির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের উল্লেখ করে গেলেও প্রধান বানির রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে তেমন কিছু জানা যায় না।

যুবরাজ: রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র ‘যুবরাজ’ উপাধিতে ভূষিত হতেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত হতেন। পাল সান্ডাজ্যে যুবরাজের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রবল। কামন্দক নীতিশাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, “অমাত্য যুবরাজশ্চ ভূজাকেতৌ মহীপতেঃ”। অর্থাৎ, অমাত্য ও যুবরাজ রাজার দুই বাহুসদৃশ। পাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন লিপি থেকে যুবরাজদের কার্যাবলি সম্পর্কে জানা যায়। যুবরাজ ত্রিভূবনপাল ধর্মপালের খালিমপুর লিপির দূতকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং যুবরাজ রাজপাল দেবপালের মুঙ্গের লিপির দূতক ছিলেন। পাল রাজ বিগ্রহপাল তাঁর পুত্র যুবরাজ নারায়ণপালকে রাজ্যভার অর্পণ করে জনপ্রস্থে গিয়েছিলেন।

কুমারামাতা। গুপ্তযুগে সাদ্ধিবিগ্রহিক, দণ্ডনায়ক, মহামন্ত্রী প্রভৃতি রাজপুরুষগণ ‘কুমারামাতা’ উপাধি ব্যবহার করতেন। অনুমিত হয়, যে সকল রাজপুরুষ বংশানুক্রমে অমাত্য পদে নিযুক্ত ছিলেন তারাই কুমারামাত্য হিসেবে পরিচিতলাভ করে। আবার কারও মতে, রাজকুমারদের অমাতা কার্য সম্পাদনের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের ‘কুমারামাত্য’ বলা হত।

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় পদক্রম ও মর্যাদার ভিত্তিতে কুমারামাত্যদের চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন- সাধারণ কুমারামাত্য, যুবরাজের পদমর্যাদাসম্পন্ন কুমারামাত্য (যুবরাজ-পাধ্যায়), প্রধান যুবরাজের পদমর্যাদাসম্পন্ন কুমারামাত্য (শ্রী-যুবরাজ- ভট্টারক-পাধ্যায়), রাজার পদমর্যাদাসম্পন্ন কুমারামাত্য (পরমভট্টারক-পাধ্যায়)।

এ ছাড়াও পাল রাষ্ট্রব্যবস্থায় আরও অনেক রাজকীয় পদ ছিল, যেমন-বিভিন্ন পদের মন্ত্রী, রাজামাত্য, সামন্ত ও মহাসামন্ত, রাজক প্রভৃতি। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ছিল ভূক্তি, বিষয় মণ্ডল, বীথি, গ্রাম। পালযুগে কর বা রাজার ব্যবস্থা ছিল সুবিন্যস্ত, মহত্তর ও মহামহত্তর, জ্যেষ্ঠকায়স্থ, ক্ষেত্রপ, মত্তরস্য, দাশাপরাধিক, শৌপ্তিক, চৌরস্বরনিক, মহাদৌঃসাধ্য-সাধনিক। এ ছাড়া ছিল আয়ব্যয় হিসাব বিভাগ, ভূমি ও কৃষি বিভাগ, পররাষ্ট্র বিভাগ, দূতক। সেনাবাহিনীতে ছিলেন মহাসেনাপতি, মহাভোগপতি, সেই মহাব্যুহপতি, মহাপিলুপধি, কোট্টপাল, প্রান্তপাল, গৌশ্মিক বলাধ্যক্ষ, মহাসন্ধি ‘বিপ্লহিক, হস্তিব্যাপৃতক, অশ্বব্যাপৃতক, উস্ট্রব্যাপৃতক, শরকতৃত কিশোর-বড়বা-গো- * মহিধাজাধিকাধ্যক্ষ। জলসেনা অর্থাৎ, নৌবাহিনীতে ছিলেন নবাধ্যক্ষ্য, তরপতি বা চরিক। ১১। পুলিশ বিভাগে ছিলেন মহাপ্রতিহার, মহাকর্তাকর্তৃক, দান্ডিক, দন্ডপাশিক, দণ্ডশক্তি। বিচার বিভাগে ছিলেন মহাদওনায়ক, দণ্ডনায়ক, ধর্মাধিকারী তদায়ূত্তক ও বিলিয়ুত্তক। ক। পরিশেষে পাল শাসনব্যবস্থাকে প্রকৃত অর্থে মৌলিক বলা যায় না। কারণ, মৌর্য ও গুপ্তযুগীয় শাসন কাঠামোর অনুকরণ পালযুগেও দেখা যায়। তবে পালযুগের রাষ্ট্রব্যবস্থা অন্য সময়ের থেকে বিকেন্দ্রীভূত ও উদারনৈতিক ছিল। পাল শাসনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসনব্যবস্থা সুগঠিত ছিল।নীহাররঞ্জন রায় পাল শাসনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বলেন, রাষ্ট্রতন্ত্রের নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য পাল শাসনে গঠিত হয়েছিল এমন নয়। বরং বলা যায় উত্তর ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সমসাময়িক উত্তর ভারতীয় রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র বিন্যাসগত অনেক অভ্যাস, বৈশিষ্ট্য ও যুগের অঞ্চলিক রাষ্ট্র আত্তীকরণ করেছিল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading