লোকসভা ও রাজ্যসভার মধ্যেকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ কর

রাজ্যসভা ও লোকসভার সাংবিধানিক সম্পর্ক:


ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা বা পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট । এই দুটি কক্ষের মধ্যে নিম্নকক্ষ হল লোকসভা এবং উচ্চকক্ষ হল রাজ্যসভা । রাজ্যসভা যেখানে অনধিক ২৫০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হতে পারে , সেখানে লোকসভার সদস্য সংখ্যা সর্বাধিক ৫৫২ হতে পারে । রাজ্যসভার সদস্যদের নির্বাচন অঙ্গরাজ্যগুলির আইনসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একক হস্তান্তরযোগ্য সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে হয়ে থাকে ।

অন্যদিকে লোকসভার সদস্যরা সরাসরি সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন । তা ছাড়া রাজ্যসভায় রাষ্ট্রপতির মোট ১২ জন সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে । তিনি বিজ্ঞান , সাহিত্য , সমাজসেবা , চারুকলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে কৃতী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে এই মনোনয়ন দেন । লোকসভায় শুধুমাত্র ইঙ্গ-ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি দুজনকে মনোনীত করেন ।

কার্যকালের দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রাজ্যসভা স্থায়ী কক্ষ এবং রাজ্যসভার সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর । প্রতি দু বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন । কিন্তু লোকসভা স্থায়ী কক্ষ নয় , লোকসভার কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর , স্বাভাবিকভাবে সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদও পাঁচ বছর । কার্যকাল শেষ হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন ।

লোকসভা ও রাজ্যসভার মধ্যে যে সাংবিধানিক সম্পর্ক রয়েছে তাকে তিনটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে । যথা—

  1. যেক্ষেত্রে রাজ্যসভা ও লোকসভা উভয়ে সমান ক্ষমতার অধিকারী ,
  2. যেক্ষেত্রে রাজ্যসভা লোকসভার চেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী এবং ও যেক্ষেত্রে লোকসভা রাজ্যসভার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী ।

রাজ্যসভা ও লোকসভার সমক্ষমতা:


( i ) পার্লামেন্টে বিল গ্রহণ সংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রে একমাত্র অর্থ বিল ছাড়া রাজ্যসভা ও লোকসভা অন্যান্য বিলের ব্যাপারে সমান ক্ষমতার অধিকারী ।

( ii ) সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও দুটি কক্ষ সমান ক্ষমতা ভোগ করে থাকে । উভয় কক্ষের সম্মতি ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা যায় না ।

( iii ) রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ও পদচ্যুতির বিষয়ে এবং উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচনের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষ সমান ক্ষমতার অধিকারী । এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ , মুখ্য নির্বাচনি অফিসার , নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক প্রমুখ পদাধিকারীকে অপসারণের ক্ষেত্রে রাজ্যসভা ও লোকসভার সমান ক্ষমতা রয়েছে ।

( iv ) আইনসভার অবমাননা বা অধিকার ভঙ্গের অভিযোগে কোনো সদস্য বা সদস্য নন এমন ব্যক্তিকে উভয় কক্ষের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আছে ।
( v ) কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হাইকোর্ট স্থাপন এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হাইকোর্টের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানো প্রভৃতি বিষয়ে দুটি কক্ষ সমান ক্ষমতার অধিকারী ।

( vi ) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ঘোষিত জরুরি অবস্থা অনুমোদনের ব্যাপারেও লোকসভা ও রাজ্যসভার সমান ক্ষমতা রয়েছে ।
রাজ্যসভার প্রাধান্য

( i ) রাজ্যসভার উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ যদি এমন প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে , জাতীয় স্বার্থে রাজ্য তালিকার কোনো বিষয়ে পার্লামেন্টের আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন , তাহলে পার্লামেন্ট সেই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে । এভাবে রাজ্যসভার একক প্রস্তাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বণ্টন ব্যবস্থার রদবদল ঘটানো সম্ভব ( ২৪৯ নং ধারা ) ।

( ii ) রাজ্যসভার উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে পার্লামেন্ট এক বা একাধিক সর্বভারতীয় চাকরি সৃষ্টির জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে ( ৩১২ নং ধারা ) ।

( iii ) উপরাষ্ট্রপতির পদচ্যুতি সংক্রান্ত প্রস্তাব শুধুমাত্র রাজ্যসভায় উত্থাপন করা যায় । এ ছাড়া আইনসভার স্থায়ী কক্ষ হিসেবে রাজ্যসভা লোকসভার তুলনায় একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা ভোগ করে ।

লোকসভার প্রাধান্য:


( i ) অর্থবিল একমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপিত হতে পারে । তা ছাড়া কোনো বিল অর্থবিল কি না সে বিষয়ে মতবিরোধ ঘটলে লোকসভার অধ্যক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় । অর্থবিল লোকসভায় গৃহীত হওয়ার পর রাজ্যসভার কাছে সুপারিশের জন্য পাঠানো হয় । কোনো অর্থবিল প্রত্যাখ্যান বা সংশোধন করার ক্ষমতা রাজ্যসভার নেই । রাজ্যসভাকে অর্থবিল সম্বন্ধে ১৪ দিনের মধ্যে তার মতামত জানাতে হয় । বিলটি এই সময়ের মধ্যে ফেরত না এলে তা গৃহীত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয় । অর্থবিলের ব্যাপারে রাজ্যসভার সুপারিশ গ্রহণ করা লোকসভার পক্ষে বাধ্যতামূলক নয় ।

( ii ) কোনো সাধারণ বিল নিয়ে লোকসভা ও রাজ্যসভার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা মীমাংসার জন্য রাষ্ট্রপতি উভয় কক্ষের এক যৌথ অধিবেশন ডাকতে পারেন । লোকসভার স্পিকারের সভাপতিত্বে এই অধিবেশনে সংখ্যা গরিষ্ঠের ভোটে বিলটির ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে লোকসভার মতামতই জয়ী হয় । কারণ সদস্য সংখ্যায় লোকসভা রাজ্যসভার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ।

( iii ) ৪৪ তম সংবিধান সংশোধনী অনুযায়ী , জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ব্যাপারে লোকসভা কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করলে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করতে বাধ্য থাকবেন ।

( iv ) কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা তার কাজকর্মের জন্য শুধুমাত্র লোকসভার কাছেই দায়বদ্ধ থাকে । মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার ক্ষমতা একমাত্র লোকসভারই রয়েছে । এই কারণে লোকসভার আস্থা হারালে মন্ত্রীসভার পতন ঘটে ।

উপসংহার
ভারতীয় পার্লামেন্টের দুই কক্ষের মধ্যে সাংবিধানিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের শেষে বলা যায় যে , কিছু ক্ষেত্রে সমমর্যাদা সম্পন্ন হলেও সামগ্রিক দিক থেকে লোকসভা রাজ্যসভা অপেক্ষা অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী । জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কক্ষ হিসেবে লোকসভার গুরুত্ব স্বভাবতই বেশি । ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতারা সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার রীতিনীতির ভিত্তিতেই দুটি কক্ষের মধ্যে সাংবিধানিক সম্পর্কের রূপরেখা স্থির করেছিলেন ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading