উত্তরবঙ্গ বা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ভাগ বা উত্তরাংশ, প্রাচীন সাহিত্যাবলিতে সবসময়ই একটি রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক একক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। কখনও পুণ্ড্রবর্ধন, আবার কখনও বরেন্দ্রভূমি এবং গৌড় নামে পরিচিত হয়েছে। বিভিন্ন কালের তাম্রশাসন, লিপি ও বৌদ্ধ, জৈন সাহিত্যাবলি থেকে জানা যায় যে, পুণ্ড্রবর্ধন মৌর্য গুপ্ত এবং পরবর্তীকালে শশাঙ্ক, কৈবর্ত, পাল ও সেনদের অধীনে ছিল। উত্তর বাংলায় বৌদ্ধধর্মের গুরুত্ব লক্ষ করা যায় নবম থেকে একাদশ শতকে পাল রাজাদের শাসনকালে। পালরাজ ধর্মপাল, দেবপাল ও মহেন্দ্রপালের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।
সপ্তম শতাব্দীর চিনদেশীয় পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁর ‘সি-ইউ-কি’ গ্রন্থে বঙ্গদেশের চারটি জনপদের রাজধানী অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্ত, গৌড়ের কর্ণসুবর্ণে আশোকনির্মিত স্তূপ দেখতে পেয়েছিলেন। যা ইঙ্গিত করে এই জনপদগুলি অবশ্যই মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন ছিল এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসার এই অঞ্চলেও বিরাজমান ছিল। মৌর্যোত্তর ও গুপ্তকালেও উত্তর বাংলায় বৌদ্ধধর্মের সলো সঙ্গে শৈব, শান্ত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উত্থান হতে থাকে। কিন্তু কখনোই তা বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে দেয়নি।
পালযুগকে বাংলায় স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয়। তিব্বত, মায়ানমার ও ভুটানে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রদর্শক ছিল পাল রাজারা। এই সময় বাংলা বিশেষ করে পুণ্ড্রবর্ধন বৌদ্ধ ধর্মচর্চা ও শিক্ষাকেন্দ্র রূপে খ্যাতিলাভ করে। নালন্দা, বিক্রমশীলা, পাহাড়পুর, জগজীবনপুর মহাবিহারগুলি এই সময় সমৃদ্ধি অর্জন করে।
ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে, গোপালকে পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে এবং তিনি বিহারে ওদন্তপুরী মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। গোপালের পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ও অনুরাগী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা মহাবিহার ছিল বৌদ্ধ ধর্মচর্চার অন্যতম কেন্দ্র।
পরবর্তী পালরাজ রামপাল তাঁর রাজত্বকালে রামাবতী নগরী ও জগদ্দল মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তেত্রাবান শাসনে রামপাল দ্বারা প্রদত্ত একটি তারা-র মূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। গোবিন্দপালের শাসনকালে তিনি তাঁর উৎকীর্ণ তাম্রশাসনগুলিতে নিজেকে ‘পরমসৌগত’ অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মের অনুগামী বলে পরিচয় দিয়েছেন।
বুদ্ধের সময়কালের কোনো সাহিত্য বা তথ্য তাঁর পুণ্ড্রবর্ধন আগমন সম্বন্ধে নিশ্চিত করে না। কিন্তু পরবর্তীকালের কিছু সাহিত্য, যেমন-হিউয়েন সাঙের বিবরণী, তিব্বতী ভিক্ষু সুমপার রচনায় বুদ্ধের পুণ্ড্রবর্ধন ভ্রমণ সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে সাঁচীতে উৎকীর্ণ দুটি শিলালেখ থেকে ‘পুন্যবর্ধন’ অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন, দেশের দুজন অধিবাসী সাঁচীতে দুটি ভোটিভ স্তূপ প্রদান করেন, যা ওই সময় উত্তর বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থান সম্পর্কে দিকনির্দেশ করে।
চৈনিক পর্যটক ইৎ-সিং উল্লেখ করেছেন যে, গুপ্ত সম্রাট মহারাজ শ্রীগুপ্ত সম্ভবত মালদার কোনো একটি অঞ্চলে একটি চৈনিক মন্দির নির্মাণ করেন। এ ছাড়াও সপ্তম শতাব্দীর চিনা সাহিত্যে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তিতে প্রায় 3000-এরও বেশি মহাযান ও হীনযান বৌদ্ধ বিহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিউয়েন সাঙের রচনায় পাল পূর্ব বংশগুলিস যেমন- সমতটের খলা বংশ, রাত বংশ প্রভৃতি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন।
উত্তর বাংলা অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রাসঙ্গিকতা লক্ষ করা যায় এখানে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ বিহারগুলি থেকে। এ ছাড়াও মহানন্দা-করতোয়া উপত্যকা থেকে প্রাপ্ত বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তিগুলি পুণ্ড্রবর্ধনের বৌদ্ধ মানসিকতার পরিচয় দেয়।
পুণ্ড্রবর্ধনের ‘পো-সি-পো’ মঠের উল্লেখ পাওয়া যায় হিউয়েন সাঙের রচনায়। এই মঠে একটি অশোকনির্মিত স্তূপের বিবরণও জানা যায়। এই বিহারটিকে বাংলাদেশের মহাস্থানগড়ের ভাসু বিহারের সঙ্গে সাদৃশ্যমূলক বলে মনে করা হয়। রাজশাহি জেলার বিহারৈল বৌদ্ধ মঠ থেকে চুনার পাথরে নির্মিত একটি দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। হিউয়েন সাঙের রচনায় ‘লো-টো-মো-টি’ অর্থাৎ, রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা ও সম্রাট অশোকনির্মিত ঢিবির পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পাহাড়পুর বা সোমপুর মহাবিহার যেটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পালরাজ ধর্মপাল, সেটি ছিল বৌদ্ধ ধর্মচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক ও বৌদ্ধমূর্তির প্রাপ্ত স্থান হিসেবে সোমপুর বিহার উল্লেখযোগ্য। উত্তর বাংলায় প্রাপ্ত বৌদ্ধ ও বোধিসত্ত্বমূর্তির বেশিরভাগই ধ্রুপদ গুপ্ত কলা থেকে অনুসৃত। এই মূর্তিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আবলোকিত্বেশ্বর মূর্তি, বোধিসত্ত্ব, তারা-র মূর্তি। এ ছাড়াও ধাতু নির্মিত বুদ্ধমূর্তিগুলি, যা উত্তর বাংলায় তথা পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলে অষ্টম শতাব্দীর পরবর্তীকালে গুপ্ত কলার সঙ্গে আঞ্চলিক কলা ও স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রিত রূপ প্রদর্শিত করে।