প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে কৈবর্তরা ছিল প্রধানত কৃষি ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ভুক্ত। এদের বাসভূমি ছিল প্রাচীন বাংলার উত্তরাংশ অর্থাৎ, বরেন্দ্রভূমি। যা পালরাজাদের অধীনে একটি অঞ্চল ছিল। ইতিহাসের অধ্যায়ে কৈবর্তদের উল্লেখ পাওয়া যায় রামায়ণের অযোধ্যা কান্ডে। যেখানে তাদের নদীতে নৌকা চালানোর স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। কৈবর্তদের আসল পরিচিতিলাভ হয় দশম শতাব্দীর শুরুতে পালরাজ দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে কৈবর্ত জাতির বিদ্রোহের দ্বারা।
উত্তর বাংলায় সংঘটিত এই বিদ্রোহকে প্রাচীন বাংলা ও ভারতের প্রথম সফল কৃষক বিদ্রোহ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। পাল আমলে কৈবর্তরা ছিল সমাজের নিয়ামক শক্তি। এদের অনেকেই রাজসভায় মন্ত্রী, সেনানায়ক ও সামস্তপদ আসীন ছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর মতে, তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজে কৈবর্তরা সংখ্যায় ও বাহুবলে ছিল প্রধান। তারা ছিল বৌশ্বধর্মের তন্ত্রদিগের সঙ্গে যুক্ত। পালরাজারা বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও শেষের দিকে তারা ব্রাহ্মণ্য পৌরাণিক ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে কৈবর্তদের সামাজিক মর্যাদা কমতে থাকে। কৈবর্ত বিদ্রোহের আসল কারণ নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে ধোঁয়াশা থাকলেও অনেক
ঐতিহাসিকই এই মত স্বীকার করেছেন যে, কৈবর্ত বিদ্রোহের মূল নায়ক দিব্য, যিনি
পালরাজ্যের পদস্থ রাজপুরুষ ছিলেন এবং দ্বিতীয় মহীপালের রাজ্য আরোহণের সময় গৃহবিবাদ এবং সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধাচারণের সুযোগ নিয়ে দিব্য নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারে আড়ালে উত্তর বাংলায় স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন। কারণ সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’-এ বরেন্দ্রকে দিব্যর রাজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কৈবর্তদের নয়।
বরেন্দ্র দখলের পর দিব্য তাঁর অনুজ বুদোক-কে উত্তর বাংলার শাসক হিসেবে সিংহাসনে আসীন করেন। বুদোকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ভীম রাজা হন। ভীমের পরাক্রম ও সুশাসনের প্রশংসা করেছেন সন্ধ্যাকর নন্দী। অবশেষে রামপালের নেতৃত্বে বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধার হয় এবং কৈবর্ত শাসনের উত্তর বাংলায় সমাপ্তি ঘটে।