পাল রাজাদের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত টাকা লেখো। (Write a brief note on the origin of the Palas.)

শশাঙ্ক পরবর্তী বাংলায় অরাজকতার যুগের অবসান ঘটিয়ে গোপাল বাংলার সিংহাসন আরোহণ করেন এবং পালবংশের সূচনা করেন। গোপালের ক্ষমতালাভ সম্বন্ধে খালিমপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, তার ছেলে শ্রীগোপালকে যিনি রাজাদের মধ্যে মুকুটমনি ছিলেন, মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটানোর জন্য প্রকৃতিগণ লক্ষ্মীর হাত গ্রহণ করেছিলেন। ‘প্রকৃতি’ শব্দ বলতে বিশেষ অর্থে ‘জনগণ’ বা ‘প্রধান কর্মচারী’ বোঝায়। কিন্তু অষ্টম শতাব্দীতে অরাজকপূর্ণ অবস্থায় জনগণের একমত হয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কথা স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। কিংবা সে সময় কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে প্রধান কর্মচারীগণেরও নির্বাচন করার প্রশ্ন ওঠে না।

গোপালের বংশ পরিচয় সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। একমাত্র খালিমপুর তাম্রশাসনে গোপালের পিতা বপ্যট (যিনি শত্রুধ্বংসকারী ছিলেন) এবং পিতামহ দয়িতবিন্ধু (যাকে সর্ববিদ্যা বিশুদ্ধ বলা হয়েছে)-র উল্লেখ আছে। এ থেকে বলা যায় গোপালের পিতা বপ্যট যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। তবে পরবর্তী পাল রাজাগণ

তাঁদের তাম্রশাসনে গোপালের পিতা বা পিতামহের আর উল্লেখ করেননি। গোপালের রাজত্বকালে সম্পর্কে সঠিকভাবে জানার উপায় নেই। ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’-এ উল্লেখ আছে যে, তিনি 27 বছর রাজত্ব করেন। অনুমান করা হয় যে, গোপাল 756 থেকে 781 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

গোপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শাসনের ওপর ভিত্তি করে তার পরবর্তী দুই উত্তরাধিকারী ধর্মপাল ও দেবপাল পাল সাম্রাজ্যকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করতে সক্ষম হন। ধর্মপাল ও দেবপালের নেতৃত্বে বাংলা ও বিহারে পাল সাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রাখার মতো শক্তি অর্জন করে। এই পাল সাম্রাজ্যের প্রথম পর্যায়কে ‘উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

সন্ধ্যাকর নন্দী রামপালকে ক্ষত্রিয়রূপে চিহ্নিত করেছেন ঠিকই কিন্তু তিনিই আবার ধর্মপালকে ‘সমূদ্রকূলপ্রদীপ’ রূপে বর্ণনা করেছেন। পাল রাজাদের সঙ্গে সমুদ্রকূলের সম্পর্কে শুধু রামচরিতেরই উল্লেখ হয়নি, ঘনরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যেও তাঁর সমর্থন আছে। এই কাব্যে বলা হয়েছে, রানি বল্লভদেবী কোনো পুত্র সন্তানের জন্ম না দেওয়ার ধর্মপাল তাকে নির্বাসনে পাঠান। বনবাসকালে সমুদ্রের ঔরসে রানির গর্ভে এক পুত্রসন্তান জন্মায়। তারানাথও পাল রাজাদের সম্পর্কে এরূপ কাহিনির অবতারণা করেছেন। তিনি বলেন, গোপালের মৃত্যুর পর তাঁর যে পুত্র রাজপদ লাভ করেন তিনি গোপালের ছোটো রানির গর্ভে সমুদ্রের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তবে সন্দেহের অবকাশ নেই, এসব কাহিনি অতিরঞ্জিত। কিন্তু পালরাজারা যে একদিন সমুদ্রসংলগ্ন অঞ্চলে রাজত্ব করতেন তা-ই হয়তো এইসব কাহিনিতে আভাসিত হয়েছে।

পালরা যে উত্তরবঙ্গের অধিবাসী ছিলেন তা প্রায় নিশ্চিত। ‘রামচরিত’-এ বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলাকে পালরাজাদের ‘জনকভূ’ বা পিতৃভূমি বলা হয়েছে। পুণ্ড্রবর্ধনের নিকটবর্তী বাংলার কোনো এক স্থানে গোপালের জন্ম হয়েছিল তা তারানাথও স্বীকার করেছেন। পালরা উত্তরবঙ্গের লোক হলেও তারা প্রথমে এ অঞ্চলেই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন এমন বোধ হয় না। তাদের আদি রাজ্যটি সম্ভবত বাংলার কমরগন্ধ অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এ অঞ্চল প্রাচীন বঙ্গাল জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গোপাল ও তাঁর বংশধরগণ সকলেই ‘পাল’ নামান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এইজন্যই এই বংশের ‘পাল’ নামকরণ। গুপ্তরাজদের ক্ষেত্রেও সেই একই জিনিস ঘটেছিল। তাঁরা সকলেই ‘গুপ্ত’ নামান্ত ধারণ করেছিলেন। সেই কারণে তাঁদের বংশের নাম ‘গুপ্ত’ হয়েছে। গোপালের মহিষী দেদ্দদেবী সম্ভবত সমতটের ভদ্র রাজবংশের কন্যা ছিলেন। খালিমপুর তাম্রশাসনের মহিষী দেদ্দদেবীকে ‘ভদ্রায়জা’ বলা হয়েছে। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ‘ভদ্রাত্মজা’ বলতে সম্ভাব্য ব্যক্তির কন্যা বুঝেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, খালিমপুর লেখতে দেবদেবীকে শিব, কুবের, ইন্দ্র, বিন্তু প্রভৃতি দেবতাদের পত্নীদের সমতুল্যরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে গোপালের মহিষীকে নিছক ভদ্রলোকের কন্যা বলা সংগত বোধ হয় না।

‘অষ্টসাহত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ গ্রন্থের হরিভদ্রকৃত টীকায় ধর্মপাল নামে জনৈক রাজকে ‘রাজভটীদিবংশপতিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সরকার এবং আরও অনেকে এই ধর্মপালকে পালরাজ ধর্মপালের সঙ্গে শনাক্ত করেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘রাজভট’ পদটিকে রাজসেনাপতি অর্থে গ্রহণ করেছেন। তাঁর অভিমত ধর্মপাল রাজভট প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের বংশে জন্মেছিলেন। কিন্তু এই রাজভট কে, সে সম্পর্কে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সরকার সুনিশ্চিত নন।

রাজরাজ রাজরাজভট নামে পূর্ববাংলার খড়গ রাজপরিবারভুক্ত ছিলেন, এই ধারণা আপাতগ্রাহ্য বলে স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এরূপ সিদ্ধান্তের সত্যতা সম্পর্কে সংশয় থেকেই যায়। প্রথমত, খড়গ বংশীয় রাজারা সকলেই খড়গযুক্ত নাম গ্রহণ করেছেন। পাল রাজারা খড়গবংশোদ্ভব হলে তাঁদের নামকরণে একই রীতি অনুসৃত হত। দ্বিতীয়ত, রাজভট পদের অর্থ নিয়ে মতভেদের অবকাশ আছে। তৃতীয়ত, হরিভদ্র যে ধর্মপালের 228-5কথা বলেছেন তিনি যে পাল সম্রাট রামপালই সেকথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় না। চতুর্থত, পতিত শব্দ সাধারণত জাতিচ্যুত, নিচ, অধর্ম-এই অর্থে ব্যবহৃত হয়, উদ্ভূত, জাত-এই অর্থে নয়। অমাত্য বৈদ্যদেবের কমৌলি তাম্রশাসন পালদের সূত্রবংশীয় অর্থাৎ ক্ষত্রিয় বলা হয়েছে। সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর ‘রামচরিত’ কাব্যে রামপালকে ক্ষত্রিয় বলে বর্ণনা করেছেন। ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক গ্রন্থে পালদের কায়স্ত পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

            আবার ‘মঞ্জুশ্রীমূলকল্প’-এ পাল রাজাদের দাসজীবী বা শূদ্র বলা হয়েছে। লক্ষ করবার। বিষয়, বৈদ্যদেব ও সন্ধ্যাকর নন্দী উভয়েই পাল রাজপরিবারে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁরা দুজনেই পালদের ক্ষত্রিয় বলে অভিহিত করেছেন। এ থেকে মনে হয়, পাল রাজারা নিজেদের ক্ষত্রিয়রূপে গণ্য করতেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে অষ্টসাহত্তিকা প্রজ্ঞাপারমিতার রাজভট পদটিকে রাজসেনাপতি অর্থে গ্রহণ করা যায়। গোপালের পূর্বপুরুষেরা যুদ্ধোপজীবী ছিলেন এই ধারণা যেন সঠিক বলে মনে হয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading