চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়—এটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজের প্রথম লিখিত ঐতিহাসিক দলিল। তাই চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহুমাত্রিক। নিচে ধারাবাহিকভাবে তা ব্যাখ্যা করা হলো—
১. বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন
চর্যাপদ (খ্রি. ১০ম–১২শ শতক) হলো প্রাচীন বাংলা ভাষার প্রথম লিখিত রূপ।
এর ভাষাকে বলা হয়—
- প্রাচীন বাংলা
- সন্ধ্যাভাষা (Sandhya-bhāṣā)
এই ভাষার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি—
- বাংলা ভাষা কীভাবে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে
- আধুনিক বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রাথমিক রূপ কী ছিল
ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসে চর্যাপদের গুরুত্ব তাই অপরিসীম।
২. বাংলা সাহিত্যের সূচনাবিন্দু
চর্যাপদই বাংলা সাহিত্যের প্রথম অধ্যায়।
এর আগে বাংলা সাহিত্যের কোনো লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায় না। ফলে—
- বাংলা কাব্যধারার সূচনা চর্যাপদের মাধ্যমে
- পরবর্তী মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়
এ কারণে চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের আদি স্তম্ভ বলা হয়।
৩. বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের ঐতিহাসিক দলিল
চর্যাপদ রচিত হয় বজ্রযানী বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের দ্বারা।
এর মাধ্যমে জানা যায়—
- পাল যুগে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের শক্তিশালী প্রভাব
- সহজিয়া দর্শন, সাধনা ও ধর্মীয় বিশ্বাস
- ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পাশাপাশি বিকল্প ধর্মধারার অস্তিত্ব
অতএব চর্যাপদ ধর্মীয় ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
৪. সমকালীন সমাজজীবনের প্রতিফলন
চর্যাপদে প্রতীক ও রূপকের আড়ালে ফুটে উঠেছে—
- কৃষক, জেলে, নৌকা, নদী, বাজার, গৃহস্থ জীবন
- গ্রামীণ সমাজ ও নিম্নবর্গের মানুষের বাস্তব জীবন
- নারীর অবস্থান ও দৈনন্দিন শ্রমজীবন
ফলে চর্যাপদ পাল যুগের সামাজিক ইতিহাস জানার একটি মূল্যবান উৎস।
৫. বাংলা কবিতার ছন্দ ও রীতির সূচনা
চর্যাপদে ব্যবহৃত হয়েছে—
- সহজ ছন্দ
- গানধর্মী কাঠামো
- লিরিকাল (গীতিকবিতা) প্রবণতা
যা পরবর্তীকালে—
- বৈষ্ণব পদাবলি
- লোকগীতি
- বাংলা গীতিকবিতার ধারায় প্রভাব ফেলে
অর্থাৎ বাংলা কাব্যরীতির ইতিহাসেও চর্যাপদের ভূমিকা মৌলিক।
৬. আবিষ্কারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেন।
এর ফলে—
- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে যায়
- বাংলা ভাষার প্রাচীনতা প্রমাণিত হয়
- পূর্ব ভারতীয় ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়
এই আবিষ্কার বাংলা সাহিত্যচর্চায় এক যুগান্তকারী ঘটনা।
৭. বহু ভাষার বিকাশে প্রভাব
চর্যাপদের ভাষা শুধু বাংলার নয়—
- অসমীয়া
- ওড়িয়া
- মৈথিলী
এই ভাষাগুলোর আদি রূপের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত।
ফলে চর্যাপদ পূর্বভারতীয় ভাষা ইতিহাসেরও মূল দলিল।
উপসংহার
চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল সাহিত্যিক নয়—ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অসামান্য। এটি বাংলা সাহিত্যের জন্মঘোষণা, বাংলা ভাষার প্রাচীন পরিচয়পত্র এবং পাল যুগের সমাজ–সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়।