বিদ্যালয় একটি সামাজিক ব্যবস্থা। “দর্শন জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, পক্ষান্তরে শিক্ষা হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম”। আলোচনা করুন।

ভূমিকা
বিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থা। সমাজের মূল্যবোধ, আদর্শ, সংস্কৃতি ও জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো বিদ্যালয়। এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে দার্শনিক ভিত্তি কাজ করে, তা হলো দর্শন। দর্শন মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে, আর শিক্ষা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই উক্তিটি— দর্শন জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, পক্ষান্তরে শিক্ষা হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম”— অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

দর্শন ও জীবনের লক্ষ্য

দর্শন মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করে।

  • দর্শন মানুষকে বলে দেয় মানুষ কেমন হবে,
  • জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী,
  • সমাজে তার দায়িত্ব কর্তব্য কী।

উদাহরণস্বরূপ—

  • আদর্শবাদী দর্শন মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ ও আত্মিক উন্নয়নকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দেখে।
  • প্রাকৃতিকতাবাদ জীবনের লক্ষ্য হিসেবে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেয়।
  • প্রগম্যাটিজম ব্যবহারিক জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানকে জীবনের লক্ষ্য বলে মনে করে।

এভাবে দর্শনই জীবনের দিকনির্দেশনা দেয়।

শিক্ষা: লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম

দর্শন যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে, শিক্ষা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপায়। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, আচরণ ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে।

  • দর্শন কি শেখাতে হবে নির্ধারণ করে,
  • শিক্ষা কিভাবে শেখানো হবে তা বাস্তবায়ন করে।

বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, শিক্ষণ-পদ্ধতি, শৃঙ্খলা, সহশিক্ষা কার্যক্রম— সবই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দর্শনের ওপর। যেমন:

  • নৈতিক মানুষ গঠনের লক্ষ্য থাকলে শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়।
  • গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্য থাকলে শিক্ষায় সহযোগিতা, মতপ্রকাশ ও নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।

বিদ্যালয় একটি সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে

বিদ্যালয় সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। এখানে সমাজের মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও আদর্শ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়।

  • দর্শন বিদ্যালয়ের আদর্শ লক্ষ্য নির্ধারণ করে,
  • শিক্ষা সেই আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ বিদ্যালয় দর্শন ও শিক্ষার সংযোগস্থল হিসেবে সমাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।

দর্শন ও শিক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক

দর্শন ছাড়া শিক্ষা দিশাহীন, আর শিক্ষা ছাড়া দর্শন বাস্তবহীন।

  • দর্শন তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়,
  • শিক্ষা সেই তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দেয়।

এই সম্পর্কের মাধ্যমেই মানবজীবন সুশৃঙ্খল ও উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়।

উপসংহার

সুতরাং বলা যায়, দর্শন মানুষের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং শিক্ষা সেই লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর হাতিয়ার। বিদ্যালয় এই দুয়ের সমন্বয়ে একটি সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যক্তিকে যোগ্য নাগরিক ও সমাজকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই উক্তিটি শিক্ষার দার্শনিক ও সামাজিক তাৎপর্য গভীরভাবে তুলে ধরে।

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading