বৈশেষিক দর্শন অনুসারে অভাব এবং এর বিভিন্ন রূপ ব্যাখ্যা করুন।

ভূমিকা

ভারতীয় দর্শনের ষড়দর্শনের মধ্যে বৈশেষিক দর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তববাদী (Realistic) দর্শন। এই দর্শনের প্রবর্তক মহর্ষি কণাদ। বৈশেষিক দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো জগতের সকল বস্তুকে তাদের প্রকৃত স্বরূপ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা এবং সেই জ্ঞান লাভের মাধ্যমে মুক্তির পথ নির্দেশ করা। এই দর্শনে জগৎকে বোঝার জন্য কয়েকটি মৌলিক শ্রেণি বা পদার্থ (Padārtha) স্বীকৃত হয়েছে।

প্রথমে বৈশেষিক দর্শনে ছয়টি পদার্থ স্বীকৃত ছিল—
১. দ্রব্য
২. গুণ
৩. কর্ম
৪. সাধারণ (সামান্য)
৫. বিশেষ
৬. সমবায়

পরবর্তীকালে উত্তরকালীন বৈশেষিক ও নব্যন্যায় দর্শনে সপ্তম পদার্থ হিসেবে অভাব (Abhāva) সংযোজিত হয়। ‘অভাব’ বলতে সাধারণ অর্থে অনুপস্থিতি বা অপ্রত্যক্ষ অস্তিত্ব বোঝালেও, বৈশেষিক দর্শনে অভাব একটি স্বতন্ত্র জ্ঞেয় ও বাস্তব পদার্থ হিসেবে স্বীকৃত।

অভাবের ধারণা বৈশেষিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান, কারণ এটি ‘নাস্তিত্ব’-কেও দর্শনীয় বাস্তবতার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অভাবের ধারণা ও সংজ্ঞা

অভাব শব্দের অর্থ

‘অভাব’ শব্দটির অর্থ হলো—
অনুপস্থিতি, নাস্তিত্ব, না থাকা বা অপ্রাপ্তি

যেমন—

  • “এই ঘরে কলম নেই”
  • “মাঠে এখন পানি নেই”

এই ধরনের জ্ঞান আমাদের প্রতিদিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যবহারিক।

বৈশেষিক দর্শনে অভাবের স্বীকৃতি

বৈশেষিক দর্শনের মতে, অভাব কেবল মানসিক কল্পনা নয়, বরং এটি একটি বাস্তব জ্ঞেয় বিষয়। কারণ—

  • অভাব সম্পর্কে আমাদের নির্দিষ্ট জ্ঞান হয়
  • এই জ্ঞান ভ্রান্ত নয়
  • অভাবও নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত

অতএব, অভাবকে অস্বীকার করলে বহু বাস্তব অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়।

অভাব কেন পদার্থ?

বৈশেষিক দর্শনে কোনো কিছুকে পদার্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রধান শর্ত হলো—
তা জ্ঞেয় হতে হবে এবং তার সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান সম্ভব হতে হবে।

অভাব এই শর্ত পূরণ করে, কারণ—

১. অভাব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা অনুমান জ্ঞান হয়
২. অভাব নির্দিষ্ট আশ্রয় ও প্রতিযোগী বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত
৩. অভাব ব্যবহারিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

উদাহরণ:
“ঘরে আগুন নেই”—এই জ্ঞান না হলে আগুন জ্বালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

এই কারণেই বৈশেষিক দর্শনে অভাবকে একটি স্বতন্ত্র পদার্থ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

অভাবের জ্ঞান কীভাবে হয়?

অভাবের জ্ঞান সাধারণত অনুপলব্ধি (Anupalabdhi) দ্বারা হয়। অনুপলব্ধি বলতে বোঝায়—যেখানে প্রত্যক্ষ হওয়ার যোগ্য বস্তু প্রত্যক্ষ না হওয়ার ফলে তার অভাবের জ্ঞান হয়।

যেমন—
আলো থাকা সত্ত্বেও টেবিলে কলম না দেখলে আমরা নিশ্চিত হই যে সেখানে কলমের অভাব আছে।

পরবর্তীকালে ন্যায় দর্শন অনুপলব্ধিকে স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

অভাবের উপাদান (Constituents of Abhāva)

বৈশেষিক দর্শন অনুসারে প্রতিটি অভাব তিনটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল—

১. প্রতিযোগী (Pratiyogī)
যে বস্তুর অভাব—যেমন কলম

২. আধার বা আশ্রয় (Ādhāra)
যেখানে অভাব—যেমন টেবিল

৩. কাল (Time)
যে সময়ে অভাব বিদ্যমান

এই তিনটি ছাড়া অভাবের ধারণা অসম্পূর্ণ।

অভাবের প্রকারভেদ

বৈশেষিক দর্শনে অভাবকে প্রধানত চার প্রকারে ভাগ করা হয়েছে—

১. প্রাগভাব
২. প্রধ্বংসাভাব
৩. অত্যন্তাভাব
৪. অন্যোন্যাভাব

এই চার প্রকার অভাব জগতের নাস্তিত্বের সকল রূপকে ব্যাখ্যা করে।

১. প্রাগভাব (Prāgabhāva)

সংজ্ঞা

প্রাগভাব হলো কোনো বস্তুর উৎপত্তির পূর্বে তার অনস্তিত্ব।

অর্থাৎ—
বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে যে অবস্থায় বস্তুটি ছিল না, সেই অনুপস্থিতিকেই প্রাগভাব বলে।

বৈশিষ্ট্য

১. আদি আছে, অন্ত নেই
প্রাগভাবের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই (উৎপত্তির মুহূর্তে তা নাশ হয়)

২. কার্য-কারণ সম্পর্কযুক্ত
প্রাগভাব কারণের পূর্বে কার্যের অনুপস্থিতি নির্দেশ করে

৩. সময়সাপেক্ষ
নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই প্রাগভাব থাকে

উদাহরণ

  • মাটির ঘট তৈরি হওয়ার আগে ঘটের অভাব
  • জন্মের আগে মানুষের অভাব

গুরুত্ব

প্রাগভাব কার্যকারণ তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

২. প্রধ্বংসাভাব (Pradhvaṁsābhāva)

সংজ্ঞা

প্রধ্বংসাভাব হলো কোনো বস্তুর বিনাশের পর তার অনস্তিত্ব।

অর্থাৎ—
বস্তু ধ্বংস হওয়ার পরে যে অনুপস্থিতি দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য

১. আদি নেই, অন্ত আছে
বস্তুর বিনাশের পর শুরু হয় এবং অনন্তকাল থাকে

২. নাশনির্ভর
বিনাশ ছাড়া প্রধ্বংসাভাব সম্ভব নয়

৩. স্থায়ী অভাব
একবার শুরু হলে আর শেষ হয় না

উদাহরণ

  • ভাঙা ঘটের পরে ঘটের অভাব
  • মৃত ব্যক্তির জীবনের অভাব

৩. অত্যন্তাভাব (Atyantābhāva)

সংজ্ঞা

অত্যন্তাভাব হলো এমন অভাব যা কখনোই ছিল না এবং কখনোই হবে না।

অর্থাৎ—
যে অভাব সর্বদা ও সর্বত্র বিদ্যমান।

বৈশিষ্ট্য

১. আদি ও অন্তহীন
২. চিরস্থায়ী অভাব
৩. বাস্তবতার সীমা নির্ধারণ করে

উদাহরণ

  • আকাশে আগুনের অভাব
  • পাথরে দুধের অভাব

তাৎপর্য

অত্যন্তাভাব জগতের স্বভাবগত সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।

৪. অন্যোন্যাভাব (Anyonyābhāva)

সংজ্ঞা

অন্যোন্যাভাব হলো দুটি ভিন্ন বস্তুর পারস্পরিক অভাব।

অর্থাৎ—
একটি বস্তু অন্য বস্তু নয়—এই পার্থক্যসূচক অভাব।

বৈশিষ্ট্য

১. পরিচয়ভিত্তিক অভাব
২. বৈচিত্র্য নির্ধারণ করে
৩. একই সঙ্গে উভয়দিকে বিদ্যমান

উদাহরণ

  • ঘট পট নয়
  • গাছ মানুষ নয়

গুরুত্ব

অন্যোন্যাভাব জগতের বৈচিত্র্য ও পৃথকত্ব ব্যাখ্যা করে।

চার প্রকার অভাবের তুলনামূলক আলোচনা

অভাবের প্রকারশুরুশেষপ্রকৃতি
প্রাগভাবআছেনেইউৎপত্তিপূর্ব
প্রধ্বংসাভাবনেইআছেবিনাশোত্তর
অত্যন্তাভাবনেইনেইচিরস্থায়ী
অন্যোন্যাভাবনেইনেইপারস্পরিক ভিন্নতা

অভাবের দার্শনিক গুরুত্ব

১. নাস্তিত্বকেও দর্শনের অন্তর্ভুক্ত করেছে
২. জ্ঞানতত্ত্বকে পূর্ণতা দিয়েছে
৩. কার্যকারণ ব্যাখ্যা সহজ করেছে
৪. বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে দর্শনের সংযোগ ঘটিয়েছে

অন্যান্য দর্শনের সঙ্গে তুলনা (সংক্ষেপ)

  • বৌদ্ধ দর্শন: অভাবকে স্বতন্ত্র সত্তা মানে না
  • মীমাংসা দর্শন: অভাবকে জ্ঞেয় মানলেও পদার্থ হিসেবে দ্বিধান্বিত
  • ন্যায় দর্শন: বৈশেষিক মত গ্রহণ করেছে

উপসংহার

বৈশেষিক দর্শন অনুসারে অভাব কেবল শূন্যতা বা নাস্তিত্ব নয়, বরং একটি বাস্তব ও স্বতন্ত্র পদার্থ। প্রাগভাব, প্রধ্বংসাভাব, অত্যন্তাভাব ও অন্যোন্যাভাব—এই চার প্রকার অভাবের মাধ্যমে জগতের সকল অনুপস্থিতি ও নাস্তিত্বকে সুসংবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অভাবের এই বিশ্লেষণ ভারতীয় দর্শনের বাস্তববাদী চিন্তাধারার এক অনন্য নিদর্শন। এটি প্রমাণ করে যে বৈশেষিক দর্শন কেবল ‘যা আছে’ তাই নয়, ‘যা নেই’—তাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দার্শনিক বিশ্লেষণের আওতায় এনেছে।

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading