ভূমিকা
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায়ই দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়— শিক্ষায় প্রযুক্তি (Technology in Education) এবং শিক্ষার প্রযুক্তি (Technology of Education)। এই দুই ধারণা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হলেও এক নয়। এদের সম্পর্কটি সমালোচনামূলকভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষায় প্রযুক্তি (Technology in Education)
শিক্ষায় প্রযুক্তি বলতে শিক্ষাদান–শেখার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিগত উপকরণের ব্যবহারকে বোঝায়। যেমন—
- কম্পিউটার, প্রজেক্টর, স্মার্ট বোর্ড
- ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া, ই-লার্নিং
- অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ
উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাকে আকর্ষণীয়, সহজ ও কার্যকর করা। এখানে প্রযুক্তি একটি সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সীমাবদ্ধতা:
শুধু যন্ত্রনির্ভর হলে শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ নাও হতে পারে; অনেক সময় প্রযুক্তি কেবল প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকে।
শিক্ষার প্রযুক্তি (Technology of Education)
শিক্ষার প্রযুক্তি হলো একটি বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ, পাঠ্যক্রম নির্মাণ, শিক্ষণ-পদ্ধতি নির্বাচন, মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই পদ্ধতিগতভাবে সংগঠিত হয়।
এটি মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
শিক্ষার প্রযুক্তি বৈশিষ্ট্য:
- শিক্ষাকে একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে দেখে
- শেখার সমস্যা সমাধানে পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে
- প্রযুক্তি এখানে একটি অংশ মাত্র, কেন্দ্র নয়
সীমাবদ্ধতা:
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ ও দক্ষ জনশক্তিনির্ভর।
শিক্ষায় প্রযুক্তি ও শিক্ষার প্রযুক্তির সম্পর্ক
- পরিপূরক সম্পর্ক
শিক্ষায় প্রযুক্তি হলো শিক্ষার প্রযুক্তির একটি অংশ। শিক্ষার প্রযুক্তি পরিকল্পনা করে, আর শিক্ষায় প্রযুক্তি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করে। - উদ্দেশ্য ও উপায়ের সম্পর্ক
শিক্ষার প্রযুক্তি শিক্ষার লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করে; শিক্ষায় প্রযুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে কাজ করে। - তত্ত্ব ও প্রয়োগের সম্পর্ক
শিক্ষার প্রযুক্তি তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত, আর শিক্ষায় প্রযুক্তি তার ব্যবহারিক প্রয়োগ। - কার্যকারিতা বৃদ্ধি
শিক্ষার প্রযুক্তির সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার ফলপ্রসূ হয় না।
সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষায় প্রযুক্তিকে শিক্ষার প্রযুক্তি হিসেবে ভুলভাবে গণ্য করা হয়। কেবল স্মার্ট ক্লাস বা ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহারে শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না, যদি তা সুপরিকল্পিত শিক্ষার প্রযুক্তির কাঠামোর মধ্যে না পড়ে। আবার শিক্ষার প্রযুক্তি বাস্তব রূপ পায় না, যদি শিক্ষায় প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না হয়। তাই একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অসম্পূর্ণ।
উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, শিক্ষায় প্রযুক্তি এবং শিক্ষার প্রযুক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও পরিপূরক সম্পর্ক বিদ্যমান। শিক্ষার প্রযুক্তি শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক কাঠামো দেয় এবং শিক্ষায় প্রযুক্তি সেই কাঠামোকে কার্যকর করে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই আধুনিক, কার্যকর ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে।