শ্রীকর নন্দীর মহাভারত অনুবাদ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত-কে বাংলাভাষী সাধারণ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। এই অনুবাদের কয়েকটি বিশিষ্টতা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো—
১. অনুবাদের সরলতা ও বোধগম্যতা
শ্রীকর নন্দী সংস্কৃত শ্লোকের আক্ষরিক অনুবাদের পরিবর্তে ভাবানুবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর মহাভারত কঠিন সংস্কৃতজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়; সাধারণ মানুষও সহজে কাহিনি ও ভাব বুঝতে পারে।
২. বাংলার লোকভাষার ব্যবহার
তিনি কাব্যে প্রাঞ্জল ও সাবলীল বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছেন। আঞ্চলিক শব্দ ও কথ্যভাষার প্রয়োগে কাহিনি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এর ফলে মহাভারত কেবল রাজদরবারের সাহিত্য নয়, গ্রামবাংলার মানুষেরও আপন কাহিনিতে পরিণত হয়।
৩. কাহিনিনির্ভর রূপদান
শ্রীকর নন্দীর অনুবাদে দার্শনিক তত্ত্বের চেয়ে ঘটনাপ্রবাহ ও কাহিনির নাটকীয়তা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। যুদ্ধ, বীরত্ব, শোক, প্রতিশোধ, ভ্রাতৃবিরোধ—এসব দিক তিনি প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
৪. মানবিক আবেগের প্রকাশ
এই অনুবাদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ। কুন্তী, দ্রৌপদী, গান্ধারী বা অর্জুনের দুঃখ, দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েন অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটে উঠেছে।
৫. ধর্ম ও নীতিবোধের সহজ উপস্থাপনা
মহাভারতের জটিল ধর্মতত্ত্ব ও নীতিবোধ শ্রীকর নন্দীর হাতে সহজ ও ব্যবহারিক রূপ পেয়েছে। ধর্ম এখানে কেবল শাস্ত্রীয় নয়, মানবজীবনের নৈতিক সংকটের আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
৬. বাংলা কাব্যধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য
তিনি মহাভারতকে বাংলার কাব্যধারার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। ছন্দ, অলংকার ও রসের প্রয়োগে অনুবাদটি অনেকাংশে স্বতন্ত্র বাংলা কাব্যের রূপ লাভ করেছে।
৭. অনুবাদ হলেও সৃষ্টিশীলতা
শ্রীকর নন্দীর মহাভারত নিছক অনুবাদ নয়; এটি একটি সৃষ্টিশীল পুনর্নির্মাণ। মূল কাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও তিনি বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির উপযোগী করে উপস্থাপন করেছেন।
উপসংহার
শ্রীকর নন্দীর মহাভারত অনুবাদের প্রধান বিশিষ্টতা হলো—সহজ ভাষা, কাহিনিনির্ভরতা, মানবিক আবেগ ও লোকজ রূপদান। এই অনুবাদের মাধ্যমে মহাভারত বাংলাভাষায় নতুন জীবন লাভ করে এবং মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।